সহকর্মীদের চোখের জল আর স্বজনদের কান্নায় শেষ বিদায় নিলেন বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুর পৌনে ২টার দিকে নগরীর কাউনিয়ার মহাশ্মশানে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
এর আগে সকাল ১১টার দিকে পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ নেওয়া হয় বরিশাল প্রেস ক্লাবে। সেখানে তাকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করেন সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
মরদেহ প্রেস ক্লাবে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেক সহকর্মী। এ সময় বরিশাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম খসরু, সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আকতার জাহান শিরিন।
এর আগে শুক্রবার রাতে নগরীর প্যারারা রোডে দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো অফিস থেকে পুলক চ্যাটার্জির (৫৭) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্ত শেষে আজ দুপুরে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পুলক চ্যাটার্জি স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তান রেখে গেছেন। দীর্ঘদিন দৈনিক সমকাল ও দৈনিক যুগান্তরে ব্যুরোপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ন্যাশনাল ডেইলিজ ব্যুরো চিফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন এই সাংবাদিক।
দৈনিক সমকালের বরিশাল অফিসপ্রধান সুমন চৌধুরী জানান, পুলক চ্যাটার্জি তাকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখে গেছেন। সেখানে সমকালে পাওনা টাকা আদায় করে তার স্ত্রীর হাতে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। বিষয়টি অফিস কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন বলেন, পুলক চ্যাটার্জি একজন সৎ ব্যক্তি ছিলেন। কখনও কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি। তিন বছর আগে সমকাল থেকে চাকরি হারানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে মিডিয়া পাড়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বিসিসি প্রশাসক বিলকিস আকতার জাহান শিরিন বলেন, আমি ছাত্ররাজনীতি থেকে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জিকে চিনি। তিনি একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও কর্মপরায়ণ সাংবাদিক ছিলেন। তার ভেতরে এতটা চাপা কষ্ট ছিল, তা আমরা কেউই বুঝিনি। তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুনুল ইসলাম বলেন, পুলক চ্যাটার্জির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
প্রসঙ্গত, মৃত্যুর আগে পুলক চ্যাটার্জি তার স্ত্রী ও মেয়ে, ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জি, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরী এবং প্রশাসনের উদ্দেশ্যে পৃথক পাঁচটি চিরকুট লিখে গেছেন।
প্রশাসনের উদ্দেশ্যে লেখা চিরকুটে নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করার কথা উল্লেখ করেছেন পুলক। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা ও চিকিৎসার নানা চেষ্টার কথাও সেখানে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি মরদেহ নিয়ে যেন পরিবারের সদস্যদের কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে অনুরোধও করেছেন তিনি।
স্ত্রী প্রিয়াংকা ও মেয়ে প্রকৃতির উদ্দেশ্যে লেখা চিরকুটে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। ছোট ভাই দীপককে স্ত্রী ও মেয়ের পাশে থাকার অনুরোধও করেছেন তিনি।
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনের উদ্দেশ্যে লেখা চিরকুটে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও স্মৃতির কথা উল্লেখ করে পরিবারের পাশে থাকার অনুরোধ করেছেন পুলক। ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জি ও তার স্ত্রী ইতির উদ্দেশ্যে লেখা চিরকুটে স্ত্রী ও মেয়েকে আগলে রাখার পাশাপাশি তার ব্যাংক হিসাব ও মুক্তিযুদ্ধের ভাতাসংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন।
দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরীর উদ্দেশ্যে লেখা চিরকুটে একসঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার স্মৃতির কথা উল্লেখ করেন পুলক। কোনো কারণে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে সমকালে তার পাওনা টাকা আদায়ের বিষয়টিও দেখার অনুরোধ করেন তিনি।
আরিফ হোসেন/এসএইচএ
