বিজ্ঞাপন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র ভূমিতে প্রথম পান চাষে সাফল্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র ভূমিতে প্রথম পান চাষে সাফল্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চল নাচোল বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল ধান ও ভুট্টার ক্ষেত। তবে ঐতিহ্যগত প্রথার বাইরে গিয়ে এবার শুষ্ক ও খরাপ্রবণ এই বরেন্দ্রভূমিতে তৈরি হয়েছে নতুন এক ইতিহাস। নাচোলে প্রথমবারের মতো সফলভাবে চাষ করা হয়েছে পান। সম্পূর্ণ নতুন এই অর্থকরী ফসলের বাম্পার ফলন ও শুভ সূচনায় এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য। স্থানীয় কৃষক রবিউল ইসলামের এই দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য দেখে পানের বরজ তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এলাকার প্রবীণ থেকে শুরু করে অনেক উদীয়মান তরুণ কৃষকও।

জানা গেছে, রাজমিস্ত্রি রবিউল ইসলাম কাজের সূত্রে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় গিয়ে প্রথম পান চাষ দেখেন। সেখান থেকেই তার মনে নিজের এলাকায় পান চাষ করার প্রবল ইচ্ছা জাগে। মোহনপুরের অভিজ্ঞ পান চাষিদের কাছ থেকে জমি নির্বাচন, বেড়া ও খুঁটি পোঁতা, চাল তৈরি এবং সার-কীটনাশক প্রয়োগের খুঁটিনাটি বিষয় সরাসরি আয়ত্ত করেন তিনি। শুরুতে ভয় আর দ্বিধা কাটাতে গতবছর মাত্র ১ কাঠা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে পান গাছ লাগান রবিউল। প্রথম চেষ্টাতেই পান চমৎকার বৃদ্ধি পেলে তার মনোবল বেড়ে যায়। 

এরপর চলতি মৌসুমে ১০ কাঠা জমিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিকভাবে বরজ স্থাপন করেন তিনি। বাঁশের খুঁটি, ছনের চাল ও চারপাশের বেড়া তৈরি এবং প্রাথমিক পরিচর্যা মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে ১ লাখ টাকারও বেশি। ইতোমধ্যে তিনি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার পান বিক্রিও শুরু করেছেন। তিনি আশা করছেন, বরজের বর্তমান অবস্থা যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে প্রাথমিক খরচের পুরো টাকা উঠে এসে চলতি মৌসুমেই অন্তত ১ লাখ টাকা মতো লাভ থাকবে তাঁর।

তবে পান চাষি রবিউলের শুরুর গল্পটা মোটেও সুখকর ছিল না। তিনি পান চাষ শুরু করলে এলাকার অনেকেই তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে বলেছিল- এত টাকা খরচ করে পান চাষ করলে ঋণে ডুবে ফকির হয়ে যেতে হবে। কিন্তু আজ যখন খরার মাটিতে পান গাছগুলো সবুজ পাতায় ভরে উঠেছে, তখন সেই মানুষগুলোই তা দেখতে আসছে, তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছে এবং বরজ তৈরির পরামর্শ নিচ্ছে। রবিউলের এই সাফল্য নাচোলের সাধারণ কৃষকদের চিন্তাধারায় দারুণ ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। প্রবীণ কৃষক থেকে শুরু করে তরুণ অনেকেই পান চাষের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

কৃষকদের মতে, এক বিঘা জমিতে ধান, গম বা মসুর ডাল চাষ করে ২০ হাজার টাকার বেশি লাভ পাওয়া কঠিন, অথচ সমপরিমাণ জমিতে পান চাষ করলে বছরে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ সম্ভব। তাই কৃষি অফিস থেকে সঠিক পরামর্শ এবং সার ও বীজের অনুদান পেলে তারাও পান চাষ করতে আগ্রহী হবেন বলে জানান তারা।

কৃষি অফিসের তথ্য মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার মাত্র ১৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয় এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলে এই প্রথম পান চাষ হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো তুলনামূলক শুষ্ক জলবায়ুতে পানের আবাদ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও বৈচিত্র্যময় উদ্যোগ।

কৃষক ও এলাকাবাসী আকবর বলেন, আমার বয়স ৫০-এর অধিক। আমরা অনেক কিছু চাষ করেছি। তবে এই এলাকায় পান চাষ হয়নি। এখন পান চাষ দেখছি। এতে আমরাও আগ্রহী।

আরেক তরুণ কৃষক আসিফ ইকবাল বলেন, ছোট থেকে বড় হয়েছি, প্রায় এখন ২৬ বছর বয়স আমার। এত দিন যাবত আমাদের এলাকাতে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল দেখে আসছি। এই প্রথম রবিউল চাচার পানের বরজ দেখছি। দেখে খুবই ভালো লাগছে আমাদের। আমাদের এলাকার অনেক কৃষক চাচা বা ভাইয়েরা এই পান চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তাই কৃষি অফিস থেকে যদি সহযোগিতা পাওয়া যায় তাহলে আমাদের এলাকাতে পান চাষের পরিমাণটা বৃদ্ধি পাবে।

নায়েব আলী নামের আরেক কৃষক বলেন, 'আমাদের এলাকাতে চাষি চাচা রবিউল ইসলাম পান চাষ করেছে। এর আগে আমরা কখনো নাচোল থানায় পান চাষ দেখিনি। এই প্রথম দেখলাম পান চাষ। গতবার অর্ধ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে পান চাষ করেছিল। এবার বাণিজ্যিকভাবে ১০ কাঠা জমিতে পান চাষ করেছে। এখন পর্যন্ত ভালো দেখতে পাচ্ছি এবং ভালো ফলন আশা করা যাচ্ছে। এটা দেখে আমরা বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ পান চাষ করতে আগ্রহী হচ্ছি। কৃষি অফিসের সহযোগিতা পেলে আমরাও পান চাষ করব। এতে করে আমাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করছি।'

আরেক কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, নাচোল উপজেলায় এর আগে আমরা কখনো পান চাষ দেখিনি। এই প্রথম পান চাষ দেখছি, আমার চাচা রবিউল ইসলাম করেছে। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম পান চাষটা হবে না। কিন্তু এবার ১০ কাঠা জমিতে পান চাষ করেছে। পানের বরজটা দেখছি, খুব সুন্দর হয়েছে। এভাবে যদি ফলন হয় আর কৃষি অফিস থেকে যদি সার, কীটনাশকসহ আরও কিছু অনুদান ও পরামর্শ দেয় তবে আমরারাও পান চাষ করব। 

তিনি বলেন, ধান, গম ও মসুর করে আমরা তেমন লাভ পাই না। এক বিঘা জমিতে বিভিন্ন শস্য ফসল করলে ২০ হাজার টাকার মতো লাভ হয়। আমরা শুনেছি এই একই পরিমাণ জমিতে পান চাষ করলে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ হয়। তাই আমরা কৃষি অফিস থেকে এমন সহযোগিতা পাই তাহলে আমরাও পান চাষ করব।

পানচাষি রবিউল ইসলাম বলেন, আমি রাজমিস্ত্রির কাজ করি, মাঝেমধ্যে আবার কৃষি কাজও করি। রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়েছিলাম রাজশাহীর মোহনপুরে। সেখানে পান চাষ দেখি এবং অভিজ্ঞতা নিই। সর্বপ্রথম আমি ১ কাঠা জমির ওপর পান চাষ করেছিলাম। জিনিসটা হবে কি না বা করতে পারব কি না- চিন্তায় ছিলাম। পরে দেখলাম খুব ভালো হয়েছে। তখন আমি বড় করে পান চাষের উদ্যোগ নিই। তারপর এই বছর আমি ১০ কাঠা জমির ওপর পান চাষ করি। এ পর্যন্ত ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার পান বিক্রি করেছি। আশা করছি সামনে খুবই ভালো ফলন পাব।

তিনি আরও বলেন, 'আমি মোহনপুরের পান চাষিদের কাছ থেকে শিখেছি কীভাবে সার দিতে হবে, কীভাবে লাগাতে হবে। সব তাদের কাছ থেকে শিখেছি। আমি সর্বপ্রথম মাটিটা বেছে নিই। তারপর এর চারিদিকে বেড়া দিই। বাঁশের খুঁটি পুঁতে চাল তৈরি করি। এসব তৈরি করতে এবং পান চাষ করতে ১ লাখ টাকার উপরে খরচ হয়েছে। আশা করছি খরচ তুলেও লাখ টাকা মতো আয় হবে। কৃষি অফিস যদি আমাদেরকে সহযোগিতা করে তবে আরও বেশি করে পান চাষ করা যাবে। এলাকার অন্যান্য ছেলেরাও পান চাষ করতে আগ্রহী আছে।'

রবিউল ইসলাম বলেন, আমি যখন সর্বপ্রথম পান চাষ শুরু করলাম, তখন এলাকার ভাই-ভাতিজা থেকে সবাই আমাকে ঠাট্টা করে। সবাই বলে, এ জিনিস কেন করছ, তুমি তো ফকির হয়ে যাবে, দেনা হয়ে যাবে, এত টাকা খরচ করে এইসব করতে যাচ্ছো। কিন্তু এটা হওয়ার পরে সবাই আমার প্রশংসা করছে। পান বরজ দেখতে আসছে এবং তারাও পান চাষ করার জন্য আমার কাছে পরামর্শ নিচ্ছে। এতে আমার খুব ভালো লাগছে। এ ছাড়া আমি তাদেরকে বলছি এটা ভালো জিনিস, এটা চাষ করলে ধানের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ হবে।

নাচোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সালেহ আকরাম বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষক ভাই রবিউল প্রথম পানের আবাদ করেছে। উনি মূলত মোহনপুর উপজেলায় যে পানের আবাদ হয় সেখান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে পান চাষ করছেন। এই জমিতে আগে ধানের চাষাবাদ হতো, কিন্তু তিনি এবার পান চাষাবাদ করছেন। ১০ কাঠা জমিতে পান চাষ করছেন। তার এই আবাদে যেন কোনো সমস্যা না হয়, রোগ-পোকা বা পরিচর্যার যে বিষয়গুলো আছে, সেই বিষয়গুলোতে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে যোগাযোগ রাখছি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। 

তিনি বলেন, কৃষির বৈচিত্র্য ধরে রাখার জন্য সবগুলো ফসলই চাষাবাদের আওতায় আনতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বরেন্দ্রভূমিতে ধান ও আমের পাশাপাশি অন্যান্য অর্থকরী ফসল চাষাবাদে মনোনিবেশ করলে আমাদের দেশ সমৃদ্ধ হবে এবং আমরা লাভবান হব। কৃষক ভাইদের অর্থনৈতিক অবস্থারও উন্নতি হবে।

আশিক আলী/আরএআর