বিজ্ঞাপন

মনপুরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

সোয়া ১ লাখ মানুষের সেবায় চিকিৎসক মাত্র ৪ জন

সোয়া ১ লাখ মানুষের সেবায় চিকিৎসক মাত্র ৪ জন

দ্বীপজেলা ভোলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন মনপুরা উপজেলায় প্রায় সোয়া ১ লাখ মানুষের বসবাস। স্থানীয়ভাবে উপজেলাবাসীর উন্নত স্বাস্থ্যসেবার শেষ ভরসাস্থল ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু চিকিৎসক-নার্সসহ নানা সংকটে যেন নিজেই ধুঁকছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। যথাযথ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন মনপুরাবাসী। তবে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস স্থানীয় সংসদ সদস্যের।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মনপুরা উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চার দশক পেরিয়ে গেলেও স্বাস্থ্যসেবার মতো  বাসিন্দাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ভোলার নদী ও সাগরবেষ্টিত মনপুরাবাসী। দ্বীপবাসীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে ১৯৮৬ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। এরপরে ২০১৪ সালে সেটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না এখানকার বাসিন্দারা। কাগজে-কলমে শয্যা বাড়লেও অবকাঠামো, জনবল ও সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। ফলে ধারণক্ষমতার তিনগুণে রোগীর চাপে যেন নিজেই অসুস্থ দ্বীপবাসীর একমাত্র ভরসাস্থল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি।

হাসপাতালটিতে চিকিৎসক, নার্সসহ বিভিন্ন স্তরে ১২৪টি পদের বিপরীতে মাত্র ৪৮ জন কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে ৩৪ জন চিকিৎসকের মধ্যে কাগজপত্রে ৯ জনের পদায়ন থাকলেও বাস্তবে চিকিৎসা দিচ্ছেন মাত্র ৪ জন। বাকিরা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করে নানা কারণ দেখিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। ফলে স্বল্প জনবল দিয়েই চলছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা।

কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে  চিকিৎসকের ৩৪টি পদের মধ্যে ২৫টিই শূন্য রয়েছে, নার্স ও মিডওয়াইফের ৩০টি পদের বিপরীতের কর্মরত আছেন ১৮ জন, তৃতীয় শ্রেণির ৩৭টি পদের ২৫টি ও চতুর্থ শ্রেণির ২২টি পদের ১৪টি পদ শূন্য রয়েছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আন্তঃবিভাগে ভর্তি থেকে প্রতিদিন গড়ে ৭৫ জন রোগী চিকিৎসা নেন এবং বহির্বিভাগে গড়ে প্রতিদিন তিন শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। অন্যদিকে অবকাঠামোগত সমস্যায় হাসাতালের মেঝে, বারান্দা ও সিঁড়ির র‍্যাম্পেও বাধ্য হয়ে চিকিৎসা নিতে হয় রোগীদের।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা উপজেলার বিচ্ছিন্ন কলাতলি চরের বাসিন্দা ছিদ্দিকুল্লাহ, আব্দুর রশিদ, ও লোকমান বলেন, আমরা আমাদের শিশু সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে এসেছি, দীর্ঘদিন ধরে জ্বরের সমস্যা। হাসপাতালে বেড পাইনি। কোনো বেড খালি না থাকায় সিঁড়ির র‍্যাম্পে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি। ফ্লোরে বিছানোর জন্য হাসপাতাল থেকে ফোমের একটি বেড দেওয়া হলেও কোনো বেডসিটের কাপর দেওয়া হয়নি। কি করবো আমরা গরিব মানুষ, অর্থবিত্ত থাকলে তো উন্নত চিকিৎসার জন্য সন্তানদের ঢাকা-বরিশাল নিয়ে যেতাম।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়ন ও মনপুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. নাছির, খলিল, সাগর ও দুলাল জানান, পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। বেড খালি না থাকায় হাসপাতালের বারান্দায় বিছানা করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। প্রতিদিন একজন ডাক্তার এসে দেখে যান। এ ছাড়া আর কোনো সেবা তারা পান না। চারদিকে ময়লা-আবর্জনার দুরগন্ধে থাকা যায় না। এগুলো পরিষ্কার করা হয় না। এখানো চিকিৎসা নিতে এসে উল্টো অসুস্থ হওয়ার উপক্রম। এখানে কোনোমতে চিকিৎসা দিয়ে ভোলা জেলা শহরের ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল অথবা বরিশালে রেফার্ড করে দায় সারেন চিকিৎসকরা।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক তপন চন্দ্র হাওলাদার ও ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন ও আব্দুল মন্নান বলেন, ভোলা এমনিতেই দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, আবার ভোলা থেকে বিচ্ছিন্ন মনপুরা উপজেলা। এটি একটি দ্বীপ, এখানে লক্ষাধিক লোকের বসবাস। এখান থেকে মূল ভূখণ্ডে যেতে নির্দিষ্ট সময়ের পর কোনো বাহন নেই। ইচ্ছে করলেই কেউ মূল ভূখণ্ডে যেতে পারবে না। অথচ এখানে যথাযথ চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা নেই। একটি উপজেলা কমপ্লেক্স থাকলেও নানা সংকটের কারণে মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চারদিকে নদীবেষ্টিত এই উপজেলায় কোনো মানুষ গুরুতর অসুস্থ হলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। অনেক সময় চিকিৎসা না পেয়েই মৃত্যু হচ্ছে অনেকের। আবার উন্নত চিকিৎসার জন্য নদী পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পথেই মারা যাচ্ছেন অনেক রোগী। সরকারের কাছে এই উপজেলা হাসপাতালটিতে চিকিৎসকসহ অন্যান্য পদে পর্যাপ্ত জনবল পদায়নের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দেওয়ার জোর দাবি জানান তারা।

মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কবির সোহেল বলেন, মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন গড়ে ৮০ জনের ওপরে রোগী ভর্তি থাকেন এবং বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন প্রায় তিন শতাধিক রোগী। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য পদের মধ্যে ৬১ ভাগ পদই খালি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির অধিকাংশ পদ খালি রয়েছে। যে কয়জন চিকিৎসক পদায়ন আছেন তাদের মধ্যে অধিকাংশই নানা কারণে ছুটিতে আছেন। ফলে মাত্র চারজন চিকিৎসক দিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি, কি করবো? প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্সসহ জনবল পেলে স্বাস্থ্য সেবার মান বাড়বে বলেও জানান তিনি।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ভোলা-৪ সংসদীয় (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের সংসদ সদস্য ও যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন মনপুরা উপজেলা সফরকালে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মান উন্নত করা এবং এটি আরও সম্প্রসারণ করার চিন্তা রয়েছে আমাদের। এছাড়া তিনি মনপুরার সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও জানান।

অতিদ্রুত মনপুরা উপজেলাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারের কাছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শুন্যপদে চিকিৎসক নার্স ও কর্মচারী নিয়োগসহ অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানের দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। 

মো. খাইরুল ইসলাম/এএমকে