ভোরের সীমান্তে গুলির শব্দে একসঙ্গে বদলে গেল তিন বাংলাদেশি যুবকের জীবন। গুলিতে আহত তিনজনের একজন আর ফিরলেন না। আসাদুল হকের নিথর দেহ ফিরেছে নিজের মাটিতে। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে যাওয়া মোস্তাকিম ও শ্রী উদার ঠাঁই হয়েছে ভারতের কারাগারে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের চান্দেরহাট সীমান্তে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আসাদুল হক (৩৮) পীরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ ইন্দ্রইল গ্রামের আব্দুল ওয়াজেদের ছেলে। আহত অপর দুই বাংলাদেশি হলেন একই উপজেলার উত্তর ইন্দ্রইল গ্রামের আহেদ আলীর ছেলে মোস্তাকিম ও নারায়ণের ছেলে শ্রী উদা।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার দিকে পতাকা বৈঠক ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে আসাদুলের মরদেহ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে আহত দুই বাংলাদেশি এখনো ভারতে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে ১৪ দিনের জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোররাতে পীরগঞ্জের চান্দেরহাট বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তের ৩৩৩ নম্বর পিলারের কাছে কয়েকজন বাংলাদেশি যুবক ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। এ সময় ভারতের উত্তর দিনাজপুরের ৬৩ নম্বর চকশিবানন্দ বিএসএফ ক্যাম্পের একটি টহলদল তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
গুলিতে আসাদুল, মোস্তাকিম ও শ্রী উদা আহত হন। পরে বিএসএফ সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে ভারতের কালিয়াগঞ্জ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেই শেষ হয়ে যায় আসাদুলের জীবন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক রাধা রানী হালদার ঠাকুর ও ভাস্কর রায়ের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তারা বিএসএফ, কালিয়াগঞ্জ থানা পুলিশ ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের বরাতে ঢাকা পোস্টকে জানান, গুলিতে আহত তিনজনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা আসাদুল হককে মৃত ঘোষণা করেন। তবে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
আসাদুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে ভারতীয় পুলিশ। পরে মরদেহটি বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্যদিকে গুলিবিদ্ধ মোস্তাকিম ও শ্রী উদাকে চিকিৎসা দেওয়ার পর গ্রেপ্তার করে ভারতীয় পুলিশ। পরে তাদের বিরুদ্ধে ভারতের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫-এর ২১ ধারাসহ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার কয়েকটি ধারায় মামলা করা হয়েছে। তাদের রায়গঞ্জ মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে আদালত ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন।

আসাদুলের মরদেহ দেশে ফেরাতে বিজিবি বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করে। রোববার দুপুরে চান্দেরহাট সীমান্তের শূন্যরেখায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে দিনাজপুর ৪২ বিজিবির এবং বিএসএফের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে আসাদুলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে রাত ১০টার দিকে বিএসএফ আসাদুলের মরদেহ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে।
নিহত আসাদুলের স্বজনেরা জানান, আসাদুল আর কোনোদিন আমাদের মাঝে ফিরবে না এটা এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। ভেবেছিলাম আহত হয়েছে, চিকিৎসা নিয়ে হয়তো বাড়ি ফিরবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরল তার মরদেহ। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই। এমনভাবে যেন আর কোনো পরিবারকে স্বজন হারানোর কষ্ট পেতে না হয়।
মোস্তাকিমের পরিবারের সদস্যরা বলেন, গুলির খবর পাওয়ার পর থেকেই আমরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি। প্রথমে জানতে পারি, সে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরে জানতে পারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে ভারতীয় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সে বেঁচে আছে এটাই এখন আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি। কিন্তু নিজের দেশে, পরিবারের কাছে ফিরতে না পারার বিষয়টি আমাদের জন্য খুব কষ্টের। আমরা চাই, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।

শ্রী উদার পরিবারের সদস্যরা বলেন, ঘটনার পর থেকে আমরা শুধু তার খবরের অপেক্ষায় আছি। গুলিতে আহত হওয়ার পর তিনি বেঁচে আছেন, কিন্তু এখন ভারতের কারাগারে। একজন মানুষ আহত হওয়ার পর চিকিৎসা পাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের কাছেও ফিরে আসতে চান। আমরা চাই, দ্রুত তার মুক্তি ও দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হোক। আমাদের পরিবারের সঙ্গে যেন অন্তত তিনি আবার ফিরে এসে কথা বলতে পারেন এটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।
বৈরচুনা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. শাহাজাহান আলী বলেন, বিএসএফের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন। তার বাড়ি আমাদের এলাকায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছি। বিষয়টি বিজিবিকে জানানো হলে তারা বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করেছে। রাতে আসাদুলের মরদেহ পেয়েছি। আর বাকি দুইজনকে ভারতের জেলে পাঠানো হয়েছে বলে শুনেছি।
৪২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা করেছি। তারা প্রক্রিয়া শেষ করে রোববার রাত ১০টার দিকে আসাদুলের মরদেহ ফেরত দিয়েছে।
রেদওয়ান মিলন / এনটি
