সড়ক আছে, কিন্তু নেই স্বাভাবিক চলাচলের সুযোগ। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও উঠে গেছে সড়কের পাথর-খোয়া। বর্ষায় গর্তে পানি জমে তৈরি হয় ছোট ছোট জলাশয়ের মতো অবস্থা। শুকনো মৌসুমে ধুলা আর খানাখন্দে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। এমন একটি সড়ক দিয়েই বছরের পর বছর চলাচল করছেন খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার নালকাটা থেকে প্রদীপ পাড়া এলাকার অন্তত ১০ থেকে ১৫ গ্রামের মানুষ।
প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নালকাটা-প্রদীপপাড়া সড়কটির কার্পেটিংয়ের কাজ শুরু হয়েছিল ছয়-সাত বছর আগে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে কাজটি পায় বান্দরবানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউটিমং কনস্ট্রাকশন। কিন্তু সড়কের একটি অংশের কাজ করার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকায় নির্মিত অংশটুকুও এখন নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পুরো সড়কই খানাখন্দে পরিণত হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কাজ অর্ধেক করে ফেলে রাখায় তাদের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েছে। এমনকি কাজ শেষ না করেই ঠিকাদার পুরো বিল তুলে নিয়েছেন বলেও তারা অভিযোগ করছেন। যদিও এলজিইডির সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী বলছেন, পুরো বিল পরিশোধের অভিযোগ সঠিক নয়, ঠিকাদার যতটুকু কাজ করেছেন, কেবল সেই পরিমাণ কাজের বিলই পেয়েছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রদীপপাড়া, মধুপাড়া, পুনরায়পাড়া, শুকনাছড়িসহ আশপাশের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি গ্রামের মানুষ এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কৃষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রতিদিনের প্রয়োজনে হাজারো মানুষকে সড়কটি ব্যবহার করতে হয়।
সড়কটির বর্তমান অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে অসুস্থ রোগী ও গর্ভবতী নারীদের। জরুরি প্রয়োজনে কোনো রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে যানবাহনে ঝাঁকুনি সহ্য করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক সময় দুর্গম ও ভাঙাচোরা সড়কের কারণে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগে গন্তব্যে পৌঁছাতে।
শুধু মানুষের যাতায়াত নয়, সড়কের বেহাল দশার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কৃষকদের ওপরও। এ এলাকার মানুষের অন্যতম আয়ের উৎস কৃষি। কিন্তু উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে নিতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। একইভাবে বাজার থেকে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য গ্রামে নিয়ে আসতেও বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

প্রদীপপাড়ার বাসিন্দা হরি কমল ত্রিপুরা বলেন, কয়েক বছর আগে রাস্তার কাজ শুরু হওয়ায় তারা আশায় ছিলেন এবার হয়তো দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ শেষ হবে। কিন্তু অর্ধেক কাজ করার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দেয়। এখন যে অংশে কাজ হয়েছিল, সেটিও নষ্ট হয়ে গেছে।
মধুপাড়ার বাসিন্দা বীরেন্দ্র ত্রিপুরার বলেন, রাস্তার কাজ শুরু হওয়ার পর ভেবেছিলাম আমাদের কষ্ট শেষ হবে। কিন্তু এখন আগের চেয়েও খারাপ অবস্থা। পুরো রাস্তা খানাখন্দে ভরা। শিশু, বয়স্ক মানুষ ও অসুস্থ রোগীদের নিয়ে চলাচল করতে খুব কষ্ট হয়।
রাম কানাইপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুমেধা চাকমা বলেন, সড়কটি এখন এমন অবস্থায় রয়েছে যে এটিকে পুরোপুরি পাকা বা কাঁচা কোনোটিই বলা যায় না। প্রতিদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই রাস্তা দিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। বিশেষ করে ছোট শিশুদের যাতায়াতে সমস্যা বেশি হয়। দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা হলে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর সড়কটি এভাবে পড়ে থাকায় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
তাদের দাবি, পুরোনো কাজের জটিলতা দ্রুত শেষ করে নতুন ঠিকাদারের মাধ্যমে সড়কের বাকি কাজ শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে মানসম্মতভাবে কাজ শেষ করে দীর্ঘমেয়াদে চলাচলের উপযোগী সড়ক নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউটিমং কনস্ট্রাকশনের মালিক ইউটি মংয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানছড়ি উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা প্রকৌশলী মো. রাজু আহমেদ বলেন, নালকাটা থেকে শুকনাছড়ি (প্রদীপ পাড়া) পর্যন্ত সড়কটির কাজ ইউটিমং নামের ঠিকাদারের অধীনে ছিল। ঠিকাদার সড়কের বেইস পর্যন্ত কাজ করার পর আর কাজ করেননি। একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার পরও কাজ শুরু না করায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঠিকাদারের কাজ বাতিল করা হয়েছে এবং জরিমানাও আরোপ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সড়কটির বাকি কাজের জন্য নতুন করে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে। সেটি অনুমোদনের পর টেন্ডার আহ্বান করা হবে। আগামী মাস থেকে নতুন ঠিকাদারের মাধ্যমে সড়কটির কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুরো বিল তুলে নেওয়ার বিষয়ে এলাকাবাসীর অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলী বলেন, অভিযোগটি সঠিক নয়। ঠিকাদার যতটুকু কাজ করেছেন, সেই কাজের পরিমাণ অনুযায়ীই বিল পেয়েছেন।
মোহাম্মদ শাহজাহান/আরএআর
