বিজ্ঞাপন

৮০ শতাংশ বিষহীনের দংশন

দেড়মাসে সাপের কামড়ে মরেছে চার, আক্রান্ত ৩৯২ জন

দেড়মাসে সাপের কামড়ে মরেছে চার, আক্রান্ত ৩৯২ জন

গৃহবধূ বিথি খাতুন (২৫) গোখরা সাপের কামড়ে (দংশন) আক্রান্ত হন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে। তাকে প্রথম ওঝাড় কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বেগতিক দেখে ৯ টা ৫০ মিনিটে আনা হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তবে আক্রান্ত বিথি ও তার স্বজনরা চাননি রোগীকে অ্যান্টিভেনাম দেওয়া হোক। অ্যান্টিভেনাম না নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সে রাজশাহী হাসপাতালে নেওয়ার পথে বিথির মৃত্যু হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, ওঝার কাছে সময় নষ্ট ছাড়াও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনাম না নেওয়ায় কারণে বিথির জীবন সঙ্কটময় হয়ে যায়। যার ফলে শেষ পরিণতি দেখতে হয় তার স্বাজনদের।  

বিথি খাতুন রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার পলাশীফতেপুরে চরের জহরুল ইসলামের স্ত্রী। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে ঘরে থাকা ইদুরের গর্তে মাটি দিতে গিয়ে গোখরা সাপ তার বামহাতে কামড়ে দেয়। স্থানীয়রা ওই সাপ ধরে মাটির পাত্রে রাখেন। স্বজনরা প্রথমে বিথিকে স্থানীয় ওঝাড় কাছে নেয়। সেখানে ঝাড়ফুঁক দিয়ে কাজ না হলে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু বিথি ও তার স্বজনরা অ্যান্টিভেনাম নিতে অপরাগত জানান।

সেই সময় বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার মাসুম আহমেদ দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, রোগীকে অ্যান্টিভেনাম দেওয়ার জন্য কাউন্সিলিং করছিলাম। রোগীর সঙ্গে পুরুষ মানুষ ছিলেন। তারা চাচ্ছিলেন না যে অ্যান্টিভেনাম দেওয়া হোক। তখন তারা কারো সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করছিলেন। তখন তিনি অ্যান্টিভেনাম না দিয়ে রাজশাহীতে চলে আসতে বলেন। দ্রুত সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করে দেওয়া হলে তারা রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা দেয়। পরে শুনি মেয়েটা মারা গেছে।

তিনি বলেন, বিষয়টা আমাদের খারাপ লেগেছে। কারণ রোগীকে রাজশাহী মেডিকেলে নিয়ে গেলেও তো অ্যান্টিভেনাম দেবে। আমাদের এখানে অ্যান্টিভেনাম দিলে তো কোনো সমস্যা ছিল না। বরং রোগীর মৃত্যু ঝুঁকিটা কমতো। তারা ওঝাড় কাছে নিয়ে গিয়েছে। সেখানেও সময় নষ্ট করেছে। সবচেয়ে খারাপ লেগেছে অ্যান্টিভেনাম আনার পরেও তারা নেয়নি।

তবে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেওয়া ভর্তি ফর্মের মুঠোফোন নম্বরে কল করে বন্ধ পাওয়া গেছে। তাই এ বিষয়ে মৃত বিথির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়ানি।

এ বিষয়ে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অসীম কুমার বলেন, আমাদের এখানে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনাম রয়েছে রোগীকে দেওয়ার জন্য। রোববার এক নারীকে তার স্বজনরা হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। কিন্তু তারা অ্যান্টিভেনাম না নিয়ে রাজশাহী হাসপাতালে চলে গেছেন। পরে শুনছি, ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে। প্রাণহানি রোধে সরকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনাম দিয়েছে। কিন্তু রোগী ও তার স্বজনরা অ্যান্টিভেনাম নেয় না। এটা দুঃখজনক।  

সম্প্রতি পদ্মার পানি বৃদ্ধি ছাড়াও খাল-বিলে বৃষ্টির পানি জমেছে। ফলে সাপের আবাস্থল নষ্ট হয়েছে। এতে করে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে এসে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাপ মারা পড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাপের কামড়ে মানুষ মারা পড়ছে। এদিকে বর্ষা মৌসুমে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি মাথায় রেখে জেলার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনাম রাখা কথা জানিয়েছেন রাজশাহী সিভিল সার্জন। 

সিভিল সার্জন ডা. এস.আই.এম রাজিউল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনাম রয়েছে। সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনাম পাচ্ছেন। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয় গোদাগাড়ী, বাঘা, বাগমারা উপজেলায়। সেই সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনাম রয়েছে।

বিভাগের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা কেন্দ্র রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। হাসপাতালটিতে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের জন্য আলাদা বিশেষায়িত ‘স্নেকবাইট ওয়ার্ড’ করা হয়েছে। সেই ওয়ার্ডে শুধুমাত্র সাপের কামড়ে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রতিদিনই চিকিৎসা নেয় বিভাগ ছাড়াও কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা।  

সাপের কামড়ে চিকিৎসা নেওয়া রামেকের তথ্য
রামেক হাসপাতালে চলতি বছরের পুরো আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ১৩ দিনে ৩৯২ জনকে সাপের কামড় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এরমধ্যে চলতি ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০৩ জন। এছাড়া গেল আগস্ট মাসে ২৮৯ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।  চিকিৎসা নেওয়া ৩৯২ জনের মোট হিসাবে বিষহীন ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ, বিষধর ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

নির্দিষ্ট সাপের হিসাবে কেউটে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ, গোখরা ৪ দশমিক ৮ শতাংশ, গোখরা/কেউটে ২ দশমিক ৬ শতাংশ, রাসেলস ভাইপার ১ দশমিক ৮ শতাংশ। মোট মৃত্যুর হার ০ দশমকি ৭৭ শতাংশ। আর বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত ৭৭ জনের মধ্যে কেউটে ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ, গোখরা ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ, গোখরা/কেউটে ১৩ দশমকি ০ শতাংশ এবং রাসেলস ভাইপার ৯ দশমিক ১ শতাংশ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাপের কামড়ে ১০৩ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮১ জন বিষহীন সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন। আর ২২ জন আক্রান্ত হয়েছেন বিষধর সাপের কামড়ে। বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্তদের মধ্যে ১২ জন কেউটে, ৪ জন গোখরা, ৩ জন গোখরা বা কেউটে এবং ৩ জন রাসেলস ভাইপারের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে সাপের কামড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। যিনি কেউটে সাপের কামড়ে আক্রান্ত ছিলেন।

পুরো আগস্ট পর্যন্ত এই ওয়ার্ডে মোট ২৮৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৩৪ জনই বিষহীন সাপের কামড়ে আক্রান্ত, আর ৫৫ জন বিষধর সাপের কামড়ের শিকার। বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত ৫৫ জনের মধ্যে ক্রেইটের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ২৯ জন, গোখরার কামড়ে ১৫ জন, গোখরা অথবা ক্রেইটের কামড়ে ৭ জন এবং রাসেলস ভাইপারের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ জন। এ সময়ে সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মোট দুজনের মৃত্যু হয়েছে। দুজনই ক্রেইট সাপের কামড়ে আক্রান্ত ছিলেন।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের জন্য আলাদা ‘স্নেকবাইট ওয়ার্ড’ চালু করার পর মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার ফলে তাদের পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

আগস্ট পর্যন্ত স্নেকবাইট ওয়ার্ডের হিসাব বলছে, ভর্তি রোগীদের বড় অংশই বিষহীন সাপের কামড়ে আক্রান্ত। মোট ২৮৯ রোগীর মধ্যে বিষহীন সাপের কামড়ের রোগী ২৩৪ জন, যা মোট রোগীর প্রায় ৮১ শতাংশ। বিপরীতে বিষধর সাপের কামড়ের রোগী ৫৫ জন, অর্থাৎ প্রায় ১৯ শতাংশ। তবে বিষধর সাপের কামড়ের রোগীদের মধ্যেই মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। এ পর্যন্ত যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে, দুজনই ক্রেইটের কামড়ে আক্রান্ত ছিলেন।

রামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও স্নেকবাইট ওয়ার্ডের ইনচার্জ  ডা. আবু শাহীন মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন- লাস্ট দুই সপ্তাহে আক্রান্তের হার বেশি। চলতি মাসের ১৩ দিনে ১০৩ জন রোগী ভর্তি হন। এরমধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।  

তিনি বলেন, হাসপাতালে স্নেকবাইট ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। এখানে যারা রয়েছেন সবাই অভিজ্ঞ। যেকোনো সমস্যা দ্রুত সমাধান হচ্ছে। এই ওয়ার্ডেয় অ্যান্টিভেনাম রয়েছে। উপজেলাগুলো থেকে যে রোগীরা আসে তাদের একটা অ্যান্টিভেনাম দিয়ে পাঠায়ে দেয়। আমাদের এখানে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এখানে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার কারণে রোগীরা সুস্থ্য হচ্ছে। তবে একটা বড় সমস্যা আক্রান্তের পরে রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসে। তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই আমাদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়- সাপের কামড় দিলে দ্রুত হাসপাতালে আসতে।

শাহিনুল আশিক/এসএইচএ

বিজ্ঞাপন