সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উপবৃত্তির সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্থ বঞ্চিত হয়ে আসছে গাইবান্ধার ১ হাজার ৩৮৪ শিক্ষার্থী। এ হিসেব কেবল ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গেল ছয় মাসের। যার বিপরীতে অর্থের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা। এসব টাকা যাচ্ছে কোথায় বা কার পেটে? অভিভাবকরা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদেরসহ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েও মিলছে না প্রতিকার।
এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও মাঠ পর্যায়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের কাছে নেই কোনো সমাধান। এমনকি এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার (ডিপিও) দপ্তরেও কোনো তথ্যই নেই।
গাইবান্ধার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়গুলোর সূত্র জানায়, জেলার সাত উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সরকারি উপবৃত্তির সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৪ হাজার ২০৩ জন। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে ছয় উপজেলায় কেবল চলতি বছরে অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ছয় মাসে উপবৃত্তির টাকা বঞ্চিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৩৮৪ জন। যার বিপরীতে অর্থের পরিমাণ ১১ লাখ ২৯ হাজার ৫৩০ টাকা। বিগত বছর হিসেব করলে শিক্ষার্থী ও বঞ্চিত অর্থের পরিমাণ আরও বেশ বাড়বে বলে ধারণা দেন দপ্তর সংশ্লিষ্টরা।
ছয় উপজেলায় উপবৃত্তির টাকা বঞ্চিত হওয়া ১৩৮৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪২৪ জন, যার বিপরীতে অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৩১ হাজার ৫২৭ টাকা। এ ছাড়া সুন্দরগঞ্জে ২১৮ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ লাখ ৮৩ হাজর ৬৪৫ টাকা, সাদুল্লাপুরে ২২২ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫৬৮ টাকা, পলাশবাড়িতে ২২৩ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭০৩ টাকা, গোবিন্দগঞ্জে ২১৪ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ লাখ ৮১ হাজার ৫৩১ টাকা ও ফুলছড়িতে ৮৩ শিক্ষার্থীর বিপরীতে অর্থ ফেরতের পরিমাণ ৬৮ হাজার ৫৫৯ টাকা।
প্রাথমিকের উপবৃত্তির টাকা বঞ্চিত হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাইবান্ধা কলেজিয়েট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বরাবর সম্প্রতি লিখিত অভিযোগ করেছেন। ৬ সেপ্টেম্বর করা ওই অভিযোগে তিনি উপবৃত্তির সরকারি টাকা না পাওয়ার প্রতিকার ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন।
সেখানে বলা হয়েছে, গাইবান্ধা কলেজিয়েট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণি হতে অদ্যবদি শিক্ষা শুরু থেকেই সরকারি উপবৃত্তির টাকা পেয়ে আসছিল। কিন্তু সর্বশেষ গত দুই দফায় কোনো টাকা পাননি।
পত্রে অভিযোগ করে উল্লেখ করা হয়, উপবৃত্তির ১ম দফার টাকা বঞ্চিত হয়ে বিষয়টি প্রথমে শিশুটির শ্রেণি শিক্ষক এবং বিদ্যালয়ের উপবৃত্তি বিষয়ের দায়িত্বে থাকা শিক্ষিকা এবং পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষককে একাধিকবার অবগত করা হয়। সর্বশেষ বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা তাদের সংরক্ষণে থাকা ‘গৃহীত’ লেখা সম্বলিত একটি সিট দেখিয়ে টাকা প্রদান হয়েছে মর্মে জানান। এসবের মধ্যেই অন্যান্য শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তির ২য় দফার টাকাও পায়।
পরে ওই অভিভাবক নগদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে তার উপবৃত্তিতে ব্যবহৃত নগদ অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট তুলে দেখতে পান সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২ জুলাইয়ের পরে ওই অ্যাকাউন্ট নম্বরে কোনো উপবৃত্তির টাকা জমা হয়নি। পরে গত ২১ জুলাই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বরাবর লিখিতভাবে আবেদন করা হয়। এতেও বিষয়টির সন্তোষজনক কোনো সমাধান না পেয়ে টাকা উদ্ধারের প্রয়োজনীয় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়সহ কেন এবং কি কারণে টাকা পাওয়া হতে বঞ্চিত হলো তার সঠিক কারণ উদঘাটনে ব্যবস্থা নিতে আবেদন করেন।
এদিকে, সম্প্রতি কলেজিয়েট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরজুমান আরা বেগমের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ৬ শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির অর্থ নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। যা একাধিক গণমাধ্যমসহ চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব রয়েছে। বিষয়টি তদন্তে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খাইরুল ইসলামকে প্রধান করে ইতোমধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও করেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর প্রধান শিক্ষক নিজের অ্যাকাউন্টে নেওয়া টাকা ওই শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ফিরিয়ে দিয়েছেন।
প্রধান শিক্ষকের অ্যাকাউন্টে উপবৃত্তির টাকা নেওয়া ছয় শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন চতুর্থ শ্রেণির জিম। জানতে চাইলে জিমের মা স্বপ্না বেগম বলেন, কয়েকদিন আগে হেড আপা (প্রধান শিক্ষক আমাকে ডেকে ৯০৫ টাকা দিয়েছেন। বাকি টাকা পরে দিতে চেয়েছেন। আমার অ্যাকাউন্টে হঠাৎ টাকা ঢোকা বন্ধ হয়ে গেছিল।
উপবৃত্তির অর্থ বঞ্চিত হওয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করে জানান, দফায় দফায় যোগাযোগ করেও সন্তোষজনক সমাধান পাননি, তিনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের অবগত করার প্রায় দুইমাস পর জানানো হলো টাকা রিটার্ন গেছে। হঠাৎ কেন বন্ধ হলো, আর কোথায় ফেরত গেলো এটি বের হওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা কলেজিয়েট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরজুমান আরা বেগম ওই শিক্ষার্থীদের টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে প্রবেশের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং তা সমাধান করা হয়েছে বলে জানান।
তবে, এ সময় তিনি উপবৃত্তি-সংক্রান্ত অনলাইনের কাজ নিজে করেননি দাবি করে কাজটি শ্রেণি শিক্ষকের মাধ্যমে হয়েছে বলে জানান।
উপবৃত্তির টাকা বঞ্চিত হওয়া প্রশ্নে উপবৃত্তি-সংক্রান্ত আইটি বিষয়ের দায়িত্বে থাকা সদর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শহিদুল্লাহ্ বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিসে আবেদনকারী অভিভাবকের শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা আইবাসে রিটার্ন (বাউন্স) দেখানো হয়েছে। তবে, কি কারণে এমনটা হয়েছে সে সম্পর্কে জানা যায়নি, বলেন এ কর্মকর্তা।
উপবৃত্তি-সংক্রান্ত আইটি বিষয়ের দায়িত্বে থাকা সাদুল্লাপুর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল ইসলাম বলেন, নতুন নিয়ম অনুযায়ী যার আইডিকার্ড তার নামেই নগদ/বিকাশ অ্যাকাউন্ট হতে হচ্ছে। এ ছাড়া পুরাতন এনআইডি কার্ডের সঙ্গে নতুন স্মার্টকার্ডের সংখ্যার অমিল থাকার কারণে কিছু কিছু শিক্ষার্থীর টাকা বন্ধ হচ্ছে। সব ঠিক থাকার পরেও যাদের অ্যাকাউন্টে টাকা যাচ্ছে না, সেটি আমাদের জানার বাইরে।
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হান্নান বলেন, উপবৃত্তির এরকম সমস্যা-সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো সমাধানে আমাদের হাতে প্রকৃত পক্ষে কিছুই নেই। তবে, আনঅফিসিয়ালি এক সূত্রের বরাতে তিনি জানান, অর্থ ফেরত দেখানো শিক্ষার্থীরদের এসব টাকা প্রদান করা হবে। কিন্তু কোন সময়ে বা কোন প্রক্রিয়ায় এসব অর্থ ফেরত আসবে তার কোনো সদুত্তুর মেলেনি তাদের কাছে।
এক প্রশ্নের জবাবে এ কর্মকর্তা বলেন, কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নিজের অ্যাকাউন্টে শিক্ষার্থীদের টাকা নেওযার বিষয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার লক্ষ্মণ কুমার দাশ ঢাকা পোস্টকে বলেন, উপবৃত্তি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ই জেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। সম্পূর্ণ বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা অফিস দেখে থাকে। ফলে এ সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের কিছুই জানা নেই
কলেজ শিক্ষক ও গাইবান্ধা প্রেসক্লবাবের সভাপতি অমিতাভ দাস হিমুন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা অনেকভাবে আত্মসাতের ঘটনা রয়েছে। বঞ্চিত এসব শিক্ষার্থীদের টাকা আসলেই সরকারি হিসেবে ফেরত যাচ্ছে কি-না? বা কেন যাচ্ছে সেটি খতিয়ে দেখা দরকার এবং সমাধান দরকার। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা এই টাকা পাবে কি-না বা পেলেও তা কিভাবে পাবে বা কোন সময়ে পেতে পারে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের পরিষ্কার নোটিশ থাকা উচিৎ।
এ ব্যাপারে গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. রেদুয়ানুল হালিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিষয়টি জানলাম। বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে সরকারি অর্থ বঞ্চিত না হয় সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
মাসুম বিল্লাহ/এএমকে
