এখনো পরীমণিকে নিয়ে গর্ববোধ করেন শিক্ষকরা

Dhaka Post Desk

সৈয়দ মেহেদী হাসান, ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর) থেকে ফিরে

০৬ আগস্ট ২০২১, ০৩:০৬ পিএম


অডিও শুনুন

মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন চিত্রনায়িকা পরীমণি। ঢাকাসহ সারা দেশে চলছে তাকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। তবে এই নায়িকার গ্রামে তার সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক খবর পাওয়া যায়নি। তুখোড় মেধাবী হওয়ায় ‘ডানাকাটা পরী’কে নিয়ে এখনো গর্ববোধ করেন তার স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা।

খুব ছোটবেলায় মাকে হারানো পরীমণি বড় হয়েছেন নানাবাড়িতে। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলার সিংহখালী গ্রামের নানাবাড়িতেই। এই সিংহখালী গ্রামকেই পরীমণির নিজের গ্রাম ধরে নেওয়া হয়। তার দাদাবাড়ি নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায়। সেখানে কখনোই থাকেননি পরীমণি।

র‌্যাবের হাতে আটকের পর সারা দেশের মতো তার গ্রামের বাড়িতেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অবশ্য এলাকাবাসী অনেকে তাকে পরীমণি নয় চেনেন স্মৃতি নামেই। ফলে ‘পরীমণির বাড়ি কোন দিকে’- প্রশ্ন করা হলে পাল্টা প্রশ্ন করেন অনেকে, ‘গাজী বাড়ির স্মৃতির কথা বলছেন’?

Dhaka Post
পরীমণির নানার বাড়ি

ভান্ডারিয়া উপজেলার শেষ গ্রাম সিংহখালী, তার পাশেই মঠবাড়িয়া উপজেলার ছোটশৌলা গ্রাম। সেখানে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিগ্রি কলেজ। পরীমণি এখানে পড়াশোনা করেন। কলেজের ভর্তির রেজিস্ট্রারের তথ্য অনুসারে, ১৯৯২ সালের ১৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন শামসুন্নাহার স্মৃতি।

কলেজটির অধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, পরীমণির নানা সিংহখালী গ্রামের শামসুল হক গাজী। তিনি ভগীরথপুর স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন। আমি নিজেও তার ছাত্র ছিলাম।

তিনি জানান, ভগীরথপুর পুলিশ ক্যাম্পে কনস্টেবল পদে চাকরি করতেন পরীমণির বাবা নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার মনিরুল ইসলাম। শামসুল হক গাজী স্যার তার সঙ্গে মেয়ে সালমা সুলতানার বিয়ে দেন। সালমা-মনিরের সন্তান শামসুন্নাহার স্মৃতি, যাকে এখন সবাই পরীমণি নামে চেনেন।

পরীমণির মায়ের মৃত্যু আগুনে পুড়ে, বাবাকে করা হয় খুন

দক্ষিণ সিংহখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেলায়েত হোসেন জানান, ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকের কথা। তখন স্মৃতির বয়স মাত্র তিন বছর।

Dhaka Post
পরীমণি প্রাথমিকে যে স্কুলে পড়েছেন

তার বাবা মনিরুলের তখন ঢাকায় পোস্টিং। সেখানে একটি বাসায় আগুনে পুড়ে গুরুতর দগ্ধ হন স্মৃতির মা সালমা। ঢাকায় কিছুদিন চিকিৎসার পর তাকে বাবা শামসুল হক গাজীর কাছে রেখে যান মনিরুল। এর দুই মাস পর মারা যান সালমা।

এরপর থেকে স্মৃতিকে তার নানা-নানি ও খালারা লালন-পালন করেন। স্মৃতির নানি মরহুমা ফাতিমা বেগম দক্ষিণ সিংহখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর আমি প্রধান শিক্ষক হই।

স্মৃতি ওরফে পরীমণি সর্ম্পকে তিনি বলেন, ছোট থেকে স্মৃতি ভালো ছাত্রী ছিল। তার নীতি-নৈতিকতাও ভালো ছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে স্কুল থেকে একমাত্র সে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। এখন পর্যন্ত এই স্কুল থেকে আর কেউ বৃত্তি পায়নি। দেখতে খুব সুন্দর ছিল স্মৃতি। মা হারানো এতিম শিশুটিকে এলাকার সবাই অনেক আদর করত। 

Dhaka Post
পরীমণি মাধ্যমিকে যে স্কুলে পড়েছেন 

পরিমণির ছোট খালা তাসলিমা পাপিয়া বলেন, ২০১২ সালে খুন হন স্মৃতির বাবা পুলিশ কনস্টেবল মনিরুল ইসলাম। কোনো একটা কারণে তার চাকরি চলে গিয়েছিল। তখন তিনি গ্রামের বাড়িতে থেকে ব্যবসা করতেন। আমরা শুনেছি, সেই ব্যবসার বিরোধ নিয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে কুপিয়ে হত্যা করে।

কলেজে ভর্তি হয়ে হারিয়ে যান স্মৃতি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ভগীরথপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৩.৫ পেয়ে স্মৃতি ২০১১-২০১২ শিক্ষার্ষে আমার কলেজের মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর সে আর কলেজে আসেনি। অন্য কোথাও ভর্তি হতে হলে মার্কশিট নিতে হয়, তাও নেয়নি। এখনো আমার কলেজে তার মার্কশিট রয়ে গেছে। এরপর স্মৃতি কোথায় লেখাপড়া করেছে তা আমি জানি না। 

তিনি বলেন, এসএসসি পাসের আগেই ২০১০ সালের দিকে স্মৃতিকে তার নানা গাজী স্যার ছোটশৌলা গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে ইসমাইলের সঙ্গে বিয়ে দেন। জাকির হোসেন ভোলায় বসবাস করেন। তিনি জনতা ব্যাংকে চাকরি করেন। ২ বছর পরই স্মৃতির সঙ্গে ইসমাইলের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

জাহাঙ্গীর কবির বলেন, স্মৃতি বাংলাদেশের একজন বড় নায়িকা হয়ে সুনাম অর্জন করেছে, বিষয়টি আমাদের জন্য গর্বের। আমাদের কলেজের ছাত্রী হিসেবে আমরা গর্বিত। আজ (বৃহস্পতিবার) শুনলাম স্মৃতি র‌্যাবের হাতে আটক হয়েছে। কী কারণে গ্রেফতার হয়েছে আর কাদের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছে তা আমাদের জানা নেই। 

সিংহখালী ও ছোটশৌলা গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ব্যাংকার জাকির হোসেনের ছেলে ইসমাইল তখন বেকার ছিলেন। মোটরসাইকেল কেনার জন্য কিছু টাকা চেয়েছিলেন নানা শ্বশুর গাজী স্যারের কাছে। টাকা দিতে না পারায় ইসমাইল ও স্মৃতির সংসারে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। এরপর স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে তাদের বিচ্ছেদ হয়। 

Dhaka Post
পরীমণির নানা বাড়ির প্রবেশপথ

এ বিষয়ে এখন আর কোনো কথা বলতে রাজি নন পরীমণির সাবেক স্বামী ইসমাইল হোসেন। পরে আরেক বিয়ে করে এখন এক সন্তানের বাবা ইসমাইল।  এলাকায় থাকলেও সংবাদকর্মীরা ফোন দিলে জানান, তিনি ভোলায় আছেন।

পরে ভগীরথপুর বাজারের কয়েকজন দোকানদারের মাধ্যমে ইসমাইল গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে বিচ্ছেদ হওয়ার পর আজ পর্যন্ত আমরা কেউ কারো সম্পর্কে কোনো কথা বলিনি, এখনো বলব না।’ 

এলাকায় কোনো ‘অপকর্ম’ নেই পরীমণির

৯ নং ওয়ার্ড সিংহখালী গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, মাদকসহ গ্রেফতার হয়েছে স্মৃতি, ঠিক আছে, তবে যেসব অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে তা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না। এখানে যতদিন থেকেছে সে কোনো খারাপ কাজ-কর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল না। ভালো মেয়ে ছিল। গ্রামে তার কোনো অপকর্ম নেই।

পরীমণির খালু জসিম উদ্দিন বলেন, ছোটবেলা থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহ ছিল স্মৃতির। আমরা তাকে কখনো বাধা দিইনি। মা-বাবা হারানো স্মৃতি যেন ভালো থাকে আমরা সবাই সেটাই চাইতাম। স্মৃতি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অভিনয়ে, নাচে প্রথম স্থান অধিকার করত। উপজেলা ও জেলা পর্যায় থেকেও অনেক পুরস্কার অর্জন করেছে সে।

গ্রেফতারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা আমি বিশ্বাস করি না এবং কখনো করব না। কারণ নায়িকা হওয়ার পরে আমরা ঢাকায় তার বাসায় গিয়েছি। সে বাড়িতে আসত। কখনো তার এমন কোনো আচরণ চোখে পড়েনি। আমার বিশ্বাস, স্মৃতি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে।

দুই কারণে নাখোশ গ্রামবাসী

এলাকাবাসী সবাই পরীমণিকে ভালোবাসেন তেমন নয়, তার ওপর খুশি নন এমনও অনেকে আছেন। তাদের বক্তব্য, বড় নায়িকা হওয়ার পরে নিজেকে অহংকারী হিসেবে উপস্থাপন করতেন পরীমণি। ২০২০ সালে সিংহখালী গ্রামে পরীমণির বেড়াতে আসার খবর পেয়ে তার নিজের কলেজের কিছু ছাত্রী দেখা করতে এসেছিল, কিন্তু তাদের সঙ্গে দেখা করেননি পরীমণি।

তাদের আরেকটি অভিযোগ- বড় নায়িকা হওয়ার পরে প্রতি বছর ঈদুল আজহায় এফডিসিতে ৫-৬টি পশু কোরবানি করলেও গ্রামবাসীকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো কোরবানি দেননি পরীমণি! তিনি নিজের গ্রামের মানুষদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন বলে জানান তারা। 

হঠাৎ কোটিপতি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন

পরীমণির নানা শামসুল হক গাজীর সাবেক এক সহকর্মী জানান, শিক্ষকতা থেকে অবসরে গেলেও পেনশনের টাকা তুলতে পারেননি গাজী স্যার। তিনি অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থায় দিনাতিপাত করেছেন। স্মৃতি ছোটবেলা থেকে নানার সংসারে অভাব-অনটনের মধ্যে বেড়ে উঠেছে। ভান্ডারিয়া উপজেলার এক চেয়ারম্যান প্রার্থীর হাত ধরে ঢাকায় পাড়ি দেওয়ার পর ২০১৫ সালে নাম লেখান চলচ্চিত্রে। এরপরই হঠাৎ বিলাসী জীবন শুরু হয় স্মৃতির। 

ঢাকায় তার ফ্ল্যাট আছে, গাড়ি আছে। নানাকে গ্রামে একতলা বাড়ি করে দিয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এত দ্রুত কোটিপতি হওয়ার বিষয়টি সন্দেহজনক। পরীমণির নানা মাসের অর্ধেক সময় ঢাকায় তার কাছে এবং বাকি অর্ধেক সময় বাড়িতে থাকেন। তবে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিনের ধর্ষণচেষ্টার শিকার হওয়ার পর থেকে তিনি ঢাকাতেই থাকছেন। সর্বশেষ র‌্যাবের অভিযানে পরীমণি গ্রেফতারের ঘটনার দিনও তিনি ঢাকায় ছিলেন।

প্রসঙ্গত, বুধবার (০৪ আগস্ট) রাতে প্রায় চার ঘণ্টার অভিযান শেষে বনানীর বাসা থেকে পরীমণিকে আটক করে র‌্যাব। এ সময় তার বাসা থেকে ২ লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বনানী থানায় দায়ের করা মাদক আইনের মামলায় পরীমণির চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশিদের আদালত।

এসপি/জেএস

টাইমলাইন

Link copied