২৯৬টি করোনার লাশ সৎকার

লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে গেছেন তারা

Dhaka Post Desk

রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

০৮ আগস্ট ২০২১, ০৬:১২ পিএম


লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে গেছেন তারা

সৎকারকর্মী টনি সনাতন

তারাও লাশের স্বজন। মহামারি করোনাভাইরাসের ভয়কে জয় করেছেন তারা বহু আগেই। কিন্তু অনেক ‘হিরোর’ ভিড়ে তারা হারিয়ে গেছেন, থেকে গেছেন মিডিয়া আর লোকচক্ষুর আড়ালে। কারণ, পেশায় তারা ‘ডোম’।

তাদের নিয়ে কোনো নিউজ হয়নি গণমাধ্যমে; সরকার কিংবা উচ্চ মহলের কোনো সংবর্ধনাতেও নেই তারা। ন্যূনতম কৃতজ্ঞতাটুকুও পাননি তারা। কিন্তু করোনাকালে তারাই অনেক অসাধ্যকে সাধন করে চলেছেন; স্বজনরা না এলেও লাশের ‘মুখাগ্নি’ করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শশ্মানের সৎকারকর্মী টনি ডোম। ২০২০ সালের মার্চের পর থেকে করোনা যখন সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিল ভয়ার্ত এক শব্দ, করোনায় আক্রান্ত কিংবা উপসর্গ নিয়ে মৃত স্বামীর লাশ যখন স্ত্রী-সন্তানরা ধরতে ভয় পেতেন তখন থেকেই লাশের সৎকার করে যাচ্ছেন টনি ওরফে টনি সনাতন।

এই কাজে তাকে সহায়তা করছেন তার ৩ ভাই— রিপন, নয়ন ও তপন। তবে নারীর লাশের স্নান (গোসল) থেকে শুরু করে কাপড় পরিধানের কাজটি করছেন টনির স্ত্রী রানী। করোনায় আক্রান্ত লাশের দাহ বা সৎকারে হাতে গোনা ১/২টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শুরু থেকে কাজ করলেও সেসব টিমের সঙ্গেও কাজ করছে টনি, তার স্ত্রী ও ভাইয়েরা।

কিন্তু প্রায় ২ বছর ধরে এমন মহৎ কাজটি করে আসলেও টনি ও পরিবারের লোকজন রয়ে গেছেন সকলের আড়ালে। তবে মৃত অনেকের স্বজনদের কাছে অবশ্য টনি ও তার ভাইয়েরা ‘হিরো’। এমন কয়েকজন স্বজন জানান তাদের মনের কথা। অকোপটে স্বীকার করেছেন তাদের অসহায়ত্বের কথা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, ‘করোনার শুরুর দিকে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর লাশ তো ধরা দূরের কথা, তার বিছানা-বেডিং কিংবা আসবাপত্রও আমরা ছুঁয়ে দেখতে ভয় পেতাম। সেই অবস্থা এখন না থাকলেও অনেকেই এখনও লাশ ধরেন না।’

আরও একজন জানালেন, ‘আমার বাবা করোনায় মারা গিয়েছিলেন হাসপাতালে। ভয়ে বাবার লাশও ধরেও কাঁদতে পারিনি। কিন্তু টনি ডোম আমার বাবার লাশ ধরেছে, স্নান করিয়েছে, চিতায় উঠিয়েছে। আমি শুধু দূর থেকে মুখাগ্নি করেছি। আমার কাছে টনি একজন হিরো।’

অপর আরেকজন জানান, ‘করোনায় আমার আপন বড় বোন মারা গিয়েছিল ৪ মাস আগে। বাড়ি থেকে লাশ নিয়ে শশ্মানে নিয়ে আসলো টনি ও তার ভাইয়েরা। বোনকে স্নান করিয়েছিল রনির স্ত্রী রানী। আমাদের ভাই না থাকায় শেষ পর্যন্ত টনিই মুখাগ্নি করেছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভাবতে অবাক লাগে, করোনা আমাদের অকেন কিছুই শিক্ষা দিয়েছে। যে ডোম বা সৎকারকারীদের আমরা উঁচু-নীচু জাতের দোহাই দিয়ে স্পর্শও করি না, সেই টনিই আমার বোনের মুখাগ্নি করেছে। আমার চোখে টনিও একজন করোনা হিরো।’

কথা হলো সেই টনি ডোম ওরফে টনি সনাতনের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে প্রায় ২৯৬টি মৃত মানুষের সৎকারকাজে আমি প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছি। স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও অনেকের সামান্য উপসর্গ থাকলেই ভয়ে স্বজনরা লাশ ধরেন না। বহু লাশ আমি বাসা থেকে কখনও হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে বাসায় মারা গেলে স্বজনরা ভয়ে লাশ না ধরলেও আমি ও আমার ভাইয়েরা লাশ নিয়ে আসি। আমার স্ত্রী রানী সনাতন ধর্মীয় আচাররীতি মেনে নারীর লাশগুলো স্নানসহ নানা কাজ সম্পন্ন করেন।’

তবে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো কৃতজ্ঞতা পাননি বলে এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই টনির। তিনি বলেন, ‘আমি শশ্মানকালী মায়ের ভক্ত। মায়ের জায়গায় থাকি, তিনিই ভালোমন্দ দেখেন। আমি মানুষের জন্য কাজ করি। কে ধন্যবাদ দিল আর কে দিল না তা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।’

এমএসআর

Link copied