চেয়ারম্যান হওয়ার লড়াইয়ে তৃতীয় লিঙ্গের ঋতু

Dhaka Post Desk

আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঝিনাইদহ

১৯ নভেম্বর ২০২১, ০১:৫২ পিএম


ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ভোটের মাঠে লড়ছেন তৃতীয় লিঙ্গের নজরুল ইসলাম ঋতু। আওয়ামী লীগ দলীয় কোনো পদবী না থাকায় নৌকা প্রতীক পাননি তিনি। তাইতো স্বতস্ত্র প্রার্থী হয়ে আনারস প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এরই মধ্যে এলাকায় ভোটারদের মধ্যে চমক সৃষ্টি করেছেন। প্রতিদিন শত শত মানুষ তার পক্ষে মিছিল করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাচ্ছে। ঋতু ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ৬ নং ত্রিলোচনপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়ারম্যান প্রার্থী।

নজরুল ইসলাম ঋতু উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের দাদপুর গ্রামের মৃত আব্দুল কাদেরের সাত সস্তানের মধ্যে একজন। জন্মের পর তৃতীয় লিঙ্গ প্রকাশ পাওয়ায় পাঁচ বছর বয়সে ঢাকায় চলে যেতে হয়। সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতায় প্রাথমিকের গন্ডিও পেরোনো হয়নি তার। ছোটবেলা থেকেই ঢাকার ডেমরা থানায় তার দলের গুরুমায়ের কাছে বেড়ে ওঠা। এখন তার বয়স ৪৩ বছর।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, আগামী ২৮ নভেম্বর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে মালিয়াট, কোলা, জামাল, রাখালগাছি, কাষ্টভাঙ্গা, ত্রিলোচরণপুর, নিয়ামতপুর, শিমলা রোকনপুর এই আটটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যন পদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ১ নং সুন্দরপুর-দূর্গাপুর, ৯ নং বারোবাজার ও ৭ নং রায়গ্রাম ইউনিয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তাই আটটি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। 

এদিকে ৬ নং ক্রিলোচরণপুর ইউনিয়ন সব থেকে ব্যতিক্রম। ৯টি সাধারণ ওয়ার্ড ও তিনটি সংরক্ষিত ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ইউনিয়নটিতে তৃতীয় লিঙ্গের একজন স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ায়, তাকে ঘিরে বেশ উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ওই ইউনিয়নে মোট ১৯ হাজার ৬০০ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১০ হাজার ৯ জন এবং নারী ভোটার ৯ হাজার ৫৯১ জন।

সরেজমিনে দেখা যায়, নজরুল ইসলাম ঋতু মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে ভোট চাইছেন। তার সঙ্গে এলাকার যুবকদেরও ভোট চাইতে দেখা গেছে। দুদিন আগে তার নির্বাচনী পোস্টার কে বা কারা ছিঁড়ে ফেলেছে। তাতেও তিনি দমে না গিয়ে কর্মীদের সঙ্গে করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছেন। 

একই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন নজরুল ইসলাম ছানা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হয়ে হাত পাখা প্রতীকে নির্বাচন করছেন মাহবুবুর রহমান। তবে পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার এবং চায়ের দোকানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের নজরুল ইসলাম ঋতু।

ত্রিলোচরণপুর গ্রামের বাসিন্দা মোমিনুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে জানান, তাদের সুখ-দুঃখে যাকে সবসময় পাশে পাবেন এবং সৎ ও যোগ্য চেয়ারম্যান প্রার্থীকেই ভোট দেবেন। ইতোমধ্যে তৃতীয় লিঙ্গের চেয়ারম্যান প্রার্থী এলাকায় অনেক কাজ করেছেন। তিনি ঢাকাতে থাকলেও পরিবারের টানে প্রায়ই বাড়িতে আসেন। তার কষ্টার্জিত জমানো অর্থ দিয়ে ইউনিয়নবাসীর উন্নয়নে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। এলাকায় দুটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন। এলাকায় কেউ অসুস্থ বা কন্যাদায়গ্রস্ত হয়ে তার কাছে গেলে কখনও তিনি খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। এসব কারণে তাকে এবার চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চাই।

৬ নং ত্রিলোচরণপুর ওয়ার্ডের সদস্য প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান ঢাকা পোস্টকে জানান, এই নির্বাচনে তিনজন প্রার্থীর মধ্যে দুজনকে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। তারা হলেন- সরকার দলীয় নৌকা প্রতীকের মো. নজরুল ইসলাম ছানা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী তৃতীয় লিঙ্গের নজরুল ইসলাম ঋতু। 

ত্রিলোচরণপুর গ্রামের নতুন ভোটরা সবুজ হোসেন জানান, এবারের নির্বাচনে সৎ প্রার্থীকে ভোট দিতে চান তিনি। 

চেয়ারম্যান প্রার্থী নজরুল ইসলাম ঋতু ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ। আমার জন্ম এখানেই। আগে ঢাকায় থাকতাম, জনগণ আমাকে চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চেয়েছে। তাই আমি নির্বাচনে এসেছি। জনগণ আমাকে ভোট দিতে ইচ্ছুক। নির্বাচন করার কারণে বিভিন্ন জায়গা থেকে আমার ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ আসছে, ভয় এবং হুমকি দিচ্ছে। এরই মাঝে এই ইউনিয়নে আমার যতগুলো পোস্টার টাঙানো হয়েছিল গতরাতে আমার প্রত্যেকটি পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। আমি আসছি জনগণের সেবা করার জন্য, জনগণের সেবা করব, রাস্তাঘাট করব, মানুষের সুবিধা-অসুবিধা দেখব।

আমি নতুন না, বিগত ১৫ বছর ধরে জনগণের পাশে আছি। চেয়ারম্যান হলেও জনগণের পাশে থাকব এবং না হলেও জনগণের পাশেই থাকব।

তিনি আরও বলেন, চেয়ারম্যান হওয়ায় বড় কথা নয়, জনগণের ভালোবাসা পাওয়াটাই হলো বড় ব্যাপার। আমি চাই এই ইউনিয়নে নিরপেক্ষ ভোট হবে এবং আমি বিপুল ভোটে জয়ী হবো। জনগণ আমাকে ভোট দিতে চাইছে কিন্তু আমার কর্মীদের ভয়ভীতি এবং আতঙ্কে রাখছে বিরোধী দলীয় লোকজন। 

তিনি বলেন, এখানে আমি নৌকার বিরুদ্ধে ভোট করছি না। এই ইউনিয়নে দল থেকে যাকে নৌকা প্রতীক দিয়েছে তাকে মানুষ পছন্দ করছে না। এজন্য আমি তার বিপক্ষে নির্বাচন করছি, নৌকার বিপক্ষে নয়। 

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, কালীগঞ্জ উপজেলায় ১১টি ইউনিয়নে ২৮ নভেম্বর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে তিনজন চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। এ কারণে আটটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তার মধ্যে ত্রিলোচরণপুর ইউনিয়নে নজরুল ইসলাম ঋতু নামে তৃতীয় লিঙ্গের একজন চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ সরকারের আইন অনুযায়ী তৃতীয় লিঙ্গের যে কেউ নির্বাচন করার যোগ্যতা রাখে। তিনি নির্বাচনের মাঠে আনারস প্রতীক নিয়ে লড়াই করছেন।

এসপি

Link copied