আজকের সর্বশেষ

করনীতিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

Dhaka Post Desk

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

১৭ এপ্রিল ২০২১, ২১:০২

করনীতিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

বর্তমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতি এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী, বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার ( ১৭ এপ্রিল) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও রিসার্স পলিসি ইনটিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড) এর যৌথ আয়োজনে ‘এফডিআই ফর এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন অ্যান্ড স্মুথ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এ পরামর্শ দেন তারা। ইআরএফ সহ-সভাপতি এম শফিকুল আলমের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, সঞ্চালনায় ছিলেন ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশেদুল ইসলাম।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা এলডিসি থেকে উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তাদের মতামত তুলে ধরেন। ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিযোগী অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কম।

এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, গত বছর বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ একই সময়ে কম্বোডিয়ায় এই বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৪ বিলিয়ন ডলার আর ভিয়েতনামে ১৬১ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে বার্ষিক বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ জিডিপি মাত্র এক শতাংশের মতো আর ভিয়েতনামে তা প্রায় ছয় শতাংশ। অথচ সরকারের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাসহ অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বিনিয়োগের বিকল্প নেই।

দেশে প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ না আসার পেছনে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা তথা বিশ্ব ব্যাংকের ব্যবসা সহজ করার সূচকে পিছিয়ে থাকাকে অন্যতম কারন হিসেবে দায়ী করেন। বর্তমানে ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা ১৬৮তম, যেখানে ভারত ৬৩তম ও পাকিস্তান ১০৮তম। যেকোনো মূল্যে এ অবস্থার উন্নতি করতে হবে- বলেন ড. এম এ রাজ্জাক।

বিশেষত অবকাঠামো দুর্বলতা এবং যেসব অবকাঠামো রয়েছে, বিদ্যমান অবকাঠামো সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারা, শ্রমিকের দক্ষতার ঘাটতি, দুর্নীতি, ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবণতা, সম্পত্তির নিবন্ধনে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা, ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা, বিভিন্ন অবকাঠামোর অনুমোদন প্রাপ্তিতে জটিলতা তথা ব্যবসা শুরু করতে অনেক বেশি সময় লেগে যাওয়াকে দায়ী করেন রিসার্স পলিসি ইনটিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ তথা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পথে বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছর রফতানিতে বিদ্যমান সুযোগ পেতে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যেই ইউরোপ, কানাডাসহ বড় বাজারগুলোতে রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যদিকে বিনিয়োগ আকর্ষণে চলমান সীমাবদ্ধতা দ্রুত সমাধান করা বিশেষত ব্যবসা সহজ করার সূচকে উন্নতি করার পরামর্শ দেন তিনি।

বিদেশিরা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের এই সূচকটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন। এছাড়া চীন থেকে সরে আসা বিনিয়োগ ফিরে পেতে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন ড. এম এ রাজ্জাক বলেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী নেতা সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বিনিয়োগ আকর্ষণে বিদ্যমান কর ব্যবস্থাকে অন্যতম বাধা হিসেবে দায়ী করেন। তিনি বলেন, বর্তমান কর প্রদান পদ্ধতি ব্যবসাবান্ধব নয়। বর্তমান কর ব্যবস্থাপনায় ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এটি ঠিক না হলে বিদ্যমান ব্যবসাই থাকবে না, নতুন ব্যবসা তো দূরের কথা। 

বিনিয়োগ আকর্ষণে এলোমেলো চিন্তা না করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থিরের পরামর্শ নাসিম মঞ্জুর। পাশাপাশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, হালকা প্রকৌশল খাত, নন কটন তৈরি পোশাক পণ্যে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

বিদ্যমান কর কাঠামো নিয়ে অসন্তোষের কথা জানান ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমানও। তিনি কর কাঠামোর সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে বলেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করহার অনেক বেশি। এ সময় কালো টাকা বিনিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কর না দিলে সাড়ে ২২ শতাংশ লাভ। কেননা কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ থাকায় কর দিতে হয় মাত্র ১০ শতাংশ। তাহলে বোকার মত কেন ট্যাক্স দেব? 

এছাড়া কালো টাকা পুঁজিবাজার ও আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ নেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রিজওয়ান রাহমান। তিনি বলেন, কালো টাকা পুঁজিবাজারে ঢোকার পর ২০১০ সালে কী হলো? আমরা কি আবারও সেই পথে যাচ্ছি? পুঁজিবাজার ও আবাসনে না দিয়ে এই সুযোগ স্বাস্থ্য খাত, অবকাঠামোসহ এ ধরনের খাতে দেওয়া এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য খাতকেও সমান সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এমসিসিআইর সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতা ও অদূরদর্শিতার একাধিক উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, এভাবে দেশ এগিয়ে যাবে না। টার্গেটেড পলিসি নিতে হবে। তিনি সরকারের একটি প্রজ্ঞাপন তুলে ধরে বলেন, মাত্র দুটি কোম্পানির জন্য একটি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ওই পণ্য কি অন্য কোম্পানি তৈরি করে না?

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন। এক্ষেত্রে বিডার পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ঘাটতিকে ইঙ্গিত করে বলেন, দেশে কর্মরত বিদেশি ৫০ হাজার কর্মীর জন্য টিকা চাওয়া হয়েছিল। একাধিক সভা এবং চিঠি দেওয়ার পরও তা এখনও হয়নি। তারা এই টিকা পেলে তো ইতিবাচক বার্তা যেত। অবশ্য বিনিয়োগ আকর্ষণে বিডার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন তিনি।

পরিকল্পনামন্ত্রী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, এই পরিস্থিতিতে (করোনা অতিমারি) জিডিপি এগুচ্ছে, আপনারা আয় করতে পারছেন - এটা ইতিবাচক।
  
এসআই/আরএইচ

Link copied