সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের সুপারিশে তৈরি পোশাক শিল্পে অসন্তোষ

প্রতিবেশী দেশ থেকে কটন সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বস্ত্রকল (বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর) মালিকদের প্রস্তাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে এই সুপারিশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের। এ সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে তৈরি পোশাক শিল্পে বড় ধরনের ধাক্কা আসবে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
বন্ড-সুবিধা থাকবে কি থাকবে না— এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। তাই সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতার ওপর বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার চেয়ে সুপারিশ করেছে।
বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পক্ষ থেকে দুই দফা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি), যা গত ৬ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়। সেই প্রতিবেদনের আলোকে সম্প্রতি এনবিআরে সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বিটিএমএ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ভারত থেকে কম দামে প্রচুর পরিমাণে সুতা আমদানি হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলো সংকটে পড়েছে। প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেকেই বাধ্য হচ্ছে তাদের স্পিনিং মিলগুলো বন্ধ করে দিতে। এমন পরিস্থিতিতে সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
তবে, কী ধরনের বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার হলে সেটি বস্ত্রকল ও তৈরি পোশাক শিল্প উভয়ের জন্য ভালো হবে সে বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও একটি সমঝোতা হয়েছিল। অথচ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে সেই বিষয়গুলো না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করছে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকরা।
বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে আগামীকাল সোমবার যৌথ সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। সংগঠন দুটির নেতারা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে তৈরি পোশাক শিল্পের উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে ও গভীর সংকটের সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে একটা আলোচনা হয়েছিল। আলোচনায় যেভাবে সমঝোতা হয়েছিল, ঠিক ওইভাবে চিঠিটি ইস্যু হয়নি। আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল শুধুমাত্র ১০ থেকে ২৮ কাউন্টের কটন সুতায় শুল্কারোপের প্রস্তাব করা হবে। কিন্তু, চিঠিতে বিভিন্ন ধরনের সুতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতায় শুল্কারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।’
জানা গেছে, গত মাসে বিটিএমএ-র একজন সাবেক সভাপতির বাসায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র শীর্ষ নেতারা ভারতীয় সুতা আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপে সরকারের কাছে দাবি উত্থাপনে সমঝোতায় পৌঁছান। তখন সমঝোতা হয় ১০-২৮ কাউন্টের সুতায় সেফগার্ড শুল্ক চাওয়া হবে। তবে, শেষ পর্যন্ত বিটিএমএ ১০-৩০ কাউন্টের সুতায় সেফগার্ড শুল্ক দাবি করে। পোশাকশিল্পে ২৯ ও ৩০ কাউন্টের সুতাই বেশি লাগে।
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠির বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ করছি। সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখতে সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা দেয় বাংলাদেশ। এ ব্যবস্থায় শুল্ক ও কর ছাড় পেয়ে কম খরচে কাঁচামাল আনতে পারেন উদ্যোক্তারা, যা উৎপাদন ব্যয় কমায় এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। আমদানি করা সুতা দিয়ে তৈরি পণ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি করতে হয়। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত বন্ডেড গুদামে সুতা সংরক্ষণ করা যায়।
বর্তমানে ভারত থেকে আমদানি হওয়া সুতাই দেশের বেশিরভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যবহার হয়। ৩০ কার্ডের এক কেজি সুতা বাংলাদেশি মিলগুলো বিক্রি করে প্রায় ৩ মার্কিন ডলারে, যা ভারতীয় উৎপাদকেরা বিক্রি করে দুই ডলার ৬০ সেন্টে। মূলত কম দামের কারণেই বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা ভারতের সুতা আমদানি করেন।
এমএমএইচ/এমজে