নির্বাচন ঘিরে সতর্ক মুদ্রানীতি, থাকছে না তেমন পরিবর্তন

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না আসায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সোমবার বেলা ১১টায় চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি–জুন) মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট (এমপিএস) প্রকাশ করবেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এসব তথ্য জানিয়েছেন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে প্রতিবছর দুই দফায় (জানুয়ারি-জুন ও জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য) মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণের রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নতুন সরকার গঠনের আগেই আসছে এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিঘোষণা। তবে মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় না আসা ও নানা পরিস্থিতির কারণে অনেকটা ‘নিয়মরক্ষার মুদ্রানীতি’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে, যেখানে নীতি সুদহার ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আগের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা এখন নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহী। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষেই অবস্থানে আছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই ২০২৫–২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতেও বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই, এবারের ঘোষণায়ও প্রধান লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নতুন মুদ্রানীতিতে মুদ্রা সরবরাহ কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, তার দিকনির্দেশনা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার নীতি সুদহার, তবে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে তা ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। দীর্ঘদিন দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে দুই মাসে তিন দফায় নীতি সুদহার বাড়ানো হয়। এর ফলে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে ওঠার পর কমে এলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ডিসেম্বরে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে ডলারের দর দীর্ঘদিন ধরে ১২২ টাকায় স্থিতিশীল থাকায় বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে চাপ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কৃষকের ফসল উৎপাদনে কাঠামোগত পরিবর্তনকে দায়ী করা হয়েছে। বিশেষ করে বেশি লাভের আশায় ধানের বদলে অন্য ফসলে ঝোঁক বাড়ায় চাল উৎপাদন কমেছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গত নভেম্বর পর্যন্ত ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়ালেও নির্বাচনের পর বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সে কারণে আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। তবে বাজারে ডলার কেনার মাধ্যমে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করায় নভেম্বর পর্যন্ত মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে ৮ দশমিক ৯২ শতাংশে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বাজেটে তা ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নির্বাচনের পর বাড়তি চাহিদা এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে এসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে না বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এসআই/এমএসএ