যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি : পোশাক রপ্তানিতে সুযোগ দেখছেন উদ্যোক্তারা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্কহার এক শতাংশ কমানো হয়েছে। এতে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এ ছাড়া, চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে পোশাক তৈরি করে সেটি যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালে তৈরি হওয়া পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, গতকাল সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আমাদের এক লাখ কোটি টাকার ওপরে রপ্তানি হয় আমেরিকার বাজারে। আমাদের জন্য এই বাজারটা অতি সংবেদনশীল এবং অতি প্রয়োজনীয় একটা বাজার। এখানে (চুক্তিতে) আমাদের দুটো খুব বড় ধরনের অর্জন আছে। একটা অর্জন হচ্ছে আমরা ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নিয়ে এসেছি। দ্বিতীয় হচ্ছে আমাদের সকল রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৮৬ শতাংশ হচ্ছে গার্মেন্টস (তৈরি পোশাক), যা পরবর্তীতে শূণ্য শুল্কের আওতায় চলে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তুলা আমদানিকারক দেশ। মাত্র ২ শতাংশ তুলা বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। ৯৮ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমাদের জন্য খুব ভালো হবে। এটা আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেও সাহায্য করবে।
তৈরি পোশাক খাতে বড় সুযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও পোশাক রপ্তানিকারকরা। তাদের মতে, এই চুক্তির আওতায় শুল্ক কমানোয় এবং কাঁচামাল ব্যবহারের বিপরীতে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য সময়োপযোগী ও সম্ভাবনাময়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কটন ফাইবার বা ম্যানমেড ফাইবার আমদানি করে বাংলাদেশে সুতা, কাপড় ও পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করলে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। এটি একটি বড় অর্জন।
তিনি বলেন, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দাম তুলনামূলক বেশি, তবে এর মান অত্যন্ত ভালো। এই মানসম্মত কাঁচামাল ব্যবহার করে উন্নতমানের সুতা ও পোশাক তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
চুক্তির শর্ত ও হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি স্পষ্ট করতে বিজিএমইএ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি সংস্থা (ইউএসটিআর) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। বিষয়গুলো স্পষ্ট হলে সংগঠনের সদস্যদের এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জানানো হবে বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পল (রথীন্দ্র নাথ পাল) বলেন, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে কম্বোডিয়া বা ভিয়েতনামসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ কিছুটা বাড়তি সুবিধা দিতে চাচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ব্যবসায়ীক অঞ্চল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তিনি বলেন, নতুন চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমেছে। এই কমতি খুব বড় না হলেও এটি ইতিবাচক সংকেত। তবে সবচেয়ে বড় সুখবর হলো– যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে কোনো পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না।
চুক্তির সব শর্ত এখনো পুরোপুরি জানা না গেলেও আর এন পল মনে করেন, সার্বিকভাবে এই চুক্তি বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন হলে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
প্রথমে শুল্ক ধরা হয়েছিল ৩৭ শতাংশ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিকারক প্রায় ১০০টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। সে সময় বাংলাদেশের জন্য পাল্টা শুল্কহার নির্ধারণ করা হয় ৩৭ শতাংশ।
পরে তিন মাসের জন্য এই শুল্ক কার্যকর স্থগিত রাখে যুক্তরাষ্ট্র। তিন মাস পর ২০২৫ সালের ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এরপর ধারাবাহিক দর-কষাকষির পর গত বছরের ২ আগস্ট এই হার আরও কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। গত বছরের ৭ আগস্ট থেকে এই পাল্টা শুল্ক কার্যকর হয়।
এর বাইরে আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো। ফলে পাল্টা শুল্ক আরোপের পর সব মিলিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মোট শুল্কহার দাঁড়াচ্ছে ৩৪ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য, আর আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের অনুকূলে।
এশিয়ার দেশেগুলোতে ট্রাম্প যে শুল্কহার বসিয়েছেন
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ওপর নানা মাত্রায় পাল্টা শুল্ক আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে আফগানিস্তানের পণ্য আমদানিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা আছে যুক্তরাষ্ট্রের। ১৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, ইসরায়েল, জর্ডান ও কম্বোডিয়ার ওপর। ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের ওপর। শ্রীলঙ্কা, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামের ওপর ২০ শতাংশ।
এছাড়া ভারতের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলেও সম্প্রতি চুক্তি করে তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে। বড় অঙ্কের শুল্কহার এখনো আছে মিয়ানমার (৪০ শতাংশ) ও চীনের (৪৭ শতাংশ) ওপর।
এসআই/এমজে