অর্থনীতির সবুজ রূপান্তর এগিয়ে নিচ্ছে বিকাশ

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি-তে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম গ্রিনহাউজ গ্যাস বিশেষত কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ কমানো। ‘নেট জিরো’ বা ‘শূন্য কার্বন’ একটি বৈশ্বিক এজেন্ডা, যা বাংলাদেশও বাস্তবায়ন করতে চায়। কারণ বেশি মাত্রায় কার্বন নির্গমন হলে তা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়িয়ে নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মাঝে অন্যতম।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক চর্চা অনেক আগেই শুরু হয়েছে, আর এই সবুজ রূপান্তরের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশে বিকাশ–এর মতো এমএফএস প্রতিষ্ঠান ক্যাশবিহীন ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা নিত্যনতুন উদ্ভাবনী পণ্য ও সেবা আনছে, যা পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক রূপান্তরে সহায়তা করছে।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই শীর্ষ এমএফএস প্রতিষ্ঠান বিকাশ দেশের ব্যাংক লেনদেন সম্পৃক্ত না থাকা এবং পর্যাপ্ত ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে মনোনিবেশ করেছে, যাতে তারা প্রয়োজনীয় আর্থিক সেবা খুব সহজে পেতে পারেন। এমনকি খুব সাধারণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ঘরে বসেই আর্থিক সেবা নেওয়ার সুবিধা এনে বিকাশ কার্যকরভাবে ক্যাশ টাকা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে এনেছে, যা দৈনন্দিন লেনদেনে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়ক হয়েছে।
গত কয়েক বছরে বিকাশ–এর মতো প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের মধ্যে ‘ক্যাশলেস’ জীবনের দিকে একটি আচরণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। তারা নিরাপদ, সুবিধাজনক এবং ব্যবহারবান্ধব পণ্য ও সেবা এনেছে। ঘরে বসে সহজেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আর্থিক সেবা নেওয়ার সুযোগের কারণে মানুষের যাতায়াত অনেকাংশে কমানো সম্ভব হয়েছে। কেননা মানুষের ‘মোবিলিটি’ চলাচল জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায়। এমএফএস-এ লেনদেন কাগজের ব্যবহার কমাতেও সহায়ক হয়েছে।
সার্বিকভাবে তাদের সেবার পদ্ধতি কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে এনেছে। ডিজিটাল লেনদেনে এমএফএস খাতের অংশগ্রহণের পরিসংখ্যান থেকে এর পরিবেশবান্ধব প্রভাবের একটি ধারণা পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫-এর আগস্ট মাসে ‘ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি’ পর্যায়ে এমএফএসের মাধ্যমে ১০ কোটিরও বেশি লেনদেন হয়েছে। লেনদেন হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। একই মাসে প্রায় ৩ কোটি ৫৮ লাখ ব্যবসায়িক লেনদেন (মার্চেন্ট পেমেন্ট) হয়েছে, যার সঙ্গে জড়িত টাকার পরিমাণ ৬ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা।
একই মাসে এমএফএস-এর মাধ্যমে ৬০ লাখ মানুষের বেতন দেওয়া হয়েছে, যেখানে পরিশোধ করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। ওই মাসে ২ কোটি ৪০ লাখ সংখ্যক বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির মতো ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয় এমএফএসের মাধ্যমে, যাতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের জন্য এমএফএস মাধ্যমে ১২ লাখের বেশি লেনদেন হয়েছে একই সময়ে। আর এখানে টাকার পরিমাণ ১১০০ কোটি টাকা। এসব লেনদেনের উল্লেখযোগ্য অংশ হয়েছে বিকাশ–এর মাধ্যমে।
বিশ্বব্যাপী ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখছে। ইউরোপিয়ান ডিজিটাল পেমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি অ্যালায়েন্সের পক্ষে ‘অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স’ পরিবেশের ওপর ডিজিটাল পেমেন্টের প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণার ফল প্রকাশ করে গত জুন মাসে। এতে দেখা যায়, ইউরোপে ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ক্যাশবিহীন পেমেন্টের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে এবং এই অগ্রগতি বিভিন্ন দেশে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যে দেশ যত বেশি ডিজিটাল অবকাঠামোতে এগিয়ে যাবে, সেই দেশ পরিবেশের জন্য তত বেশি উপকার বয়ে আনতে পারবে।
যেভাবে ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ কমাতে ভূমিকা রাখছে বিকাশ ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ বলতে কোনো ব্যক্তি, ব্যবসা অথবা পণ্যের মাধ্যমে যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হয়, তার পরিমাণকে বুঝায়। বিকাশ–এর মতো শীর্ষস্থানীয় ফিনটেক প্রতিষ্ঠান তিন ক্ষেত্রেই ডিজিটাল সমাধান দিচ্ছে। ফলে এর ব্যবসার ধরনই ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ কমাতে ভূমিকা রাখছে। গ্রাহকরাও সবুজ প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন। দিন যত যাচ্ছে, ততই সবুজ এবং টেকসই পরিবর্তনের দিকে মনোযোগ বাড়াচ্ছে বিকাশ।
সবুজ রূপান্তর বলতে এমন নীতি ও কৌশল প্রয়োগকে বোঝানো হয়, যা পরিবেশ, সমাজ এবং অর্থনীতিকে টেকসই অগ্রগতির দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ে, কার্বন নির্গমন কমে, সম্পদের সংরক্ষণ হয় এবং একই সাথে সার্বিকভাবে পরিবেশের অবক্ষয় কমে ও সমাজে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বিকাশ বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ইউটিলিটি সেবা প্রদানকারী সংস্থা, টেলিকম অপারেটরসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজিটাল লেনদেনের ইকোসিস্টেম তৈরি করছে। এই ইকোসিস্টেম দেশের আর্থিক খাতের সবুজ রূপান্তর ত্বরান্বিত করছে। কারণ বিকাশ–এর বিভিন্ন সেবা গ্রহণের জন্য ভ্রমণ এবং কাগজপত্রের প্রয়োজন হয় না।
বিকাশ নিজস্ব পণ্য ও সেবা ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সেবাদাতার আর্থিক পণ্য ও সেবা এক প্ল্যাটফর্মে সমন্বিত করে গ্রাহকদের ডিজিটাল জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত করেছে। বৈশ্বিক ‘নেট জিরো’ এজেন্ডার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিকাশের পুরো কার্যক্রমে ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ কমাতে সহায়ক। বিকাশ অ্যাপে ডিজিটাল ঋণ, পে লেটার এবং সাপ্তাহিক ও মাসিক ডিপিএস–এর মতো আর্থিক পণ্য চালু করেছে, যে সেবা নিতে কোনো কাগজপত্র প্রয়োজন হয় না।
ক্যাশ টাকা পরিবহণের কোনো ঝামেলা নেই। এ ধরনের লেনদেন দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং স্বচ্ছ, যা গ্রাহকদের পরিবেশ সংরক্ষণে অংশ নিতে সক্ষম করে। প্রতি লেনদেনের জন্য গ্রাহকরা কাগজের রসিদের পরিবর্তে ডিজিটাল রসিদ পেয়ে যাচ্ছেন।
ডিজিটাল পেমেন্ট ধারণাকে টেকসই করার জন্য বিকাশ দেশজুড়ে প্রায় ১০ লাখ ব্যবসায়িক স্থানে কিউআর কোড স্ক্যান ও এনএফসি ট্যাপ-এর মাধ্যমে কাগজবিহীন এবং যোগাযোগহীন (কন্ট্যাক্টলেস) পেমেন্ট গ্রহণের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা ডিজিটাল পেমেন্ট খাতের সবুজ রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করছে। একই সাথে বিকাশ-এর আছে দেশজুড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার এজেন্টের বিশাল নেটওয়ার্ক। ক্যাশ টাকার দরকার হলে বা বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা নিতে হলে খুব সহজেই হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত এজেন্ট পয়েন্ট থেকে গ্রাহকরা ‘ক্যাশ ইন’ বা ‘ক্যাশ আউট’ করতে পারছেন।
একইসঙ্গে, বাংলাদেশে ইস্যু করা ভিসা, অ্যামেক্স বা মাস্টারকার্ড থেকে বিকাশ-এর ৮ কোটি ২০ লাখ গ্রাহক কোনো চার্জ ছাড়াই তাদের বিকাশ অ্যাকাউন্টে যেকোনো সময় দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে টাকা আনতে পারছেন ‘অ্যাড মানি’ সেবার মাধ্যমে। কার্ড থেকে বিকাশে তাৎক্ষণিক টাকা এনে সেন্ড মানি, মোবাইল রিচার্জ, ইউটিলিটি বিল, কেনাকাটার পেমেন্ট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফি দেওয়া, বাস-ট্রেন-বিমান-এর টিকিট কাটা, বিভিন্ন ধরনের সরকারি ফি পরিশোধ, সঞ্চয়, বিমাসহ বহু সেবা খুব সহজেই নেওয়া যাচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, বিকাশ–এর মতো ফিনটেক প্রতিষ্ঠান দৈনন্দিন কার্যক্রমে সবুজ ও টেকসই পদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বৈশ্বিক লক্ষ্যে সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। উদ্ভাবনী আর্থিক সমাধান প্রদান, টেকসই ব্যবহার উৎসাহিত করা এবং উন্নত দক্ষতার মাধ্যমে এধরনের প্রতিষ্ঠান একটি টেকসই এবং পরিবেশ-বান্ধব ভবিষ্যৎ নির্মাণে আরও অবদান রাখতে পারে।