শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত না হলেও এবার নজরদারির আওতায় আসতে যাচ্ছে দেশের বড় ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এজন্য ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি (পিআইসি)’ নামে নতুন একটি বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করা প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোকে নিয়মের আওতায় আনা হবে, যাতে তাদের ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ে।
প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, পাবলিক বা প্রাইভেট যে ধরনের কোম্পানিই হোক না কেন, নির্দিষ্ট সীমার বেশি মূলধন, আয় বা প্রভাব থাকলেই সেটি ‘পিআইসি’ হিসেবে গণ্য হবে। পিআইসি হিসেবে তালিকাভুক্ত হলে এসব কোম্পানিকে নিয়মিতভাবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানির মালিকানার একটি অংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করার বিধান রাখা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত খসড়া বিধিমালায় কিছু প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি পিআইসি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, শেয়ারবাজারের ব্রোকারেজ হাউস, ডিলার ও মার্চেন্ট ব্যাংক এবং পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানি। এছাড়া আর্থিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি টাকার বেশি, প্রাইভেট কোম্পানির ক্ষেত্রে ১৫ কোটি টাকার বেশি অথবা বার্ষিক টার্নওভার ১০০ কোটি টাকার বেশি হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পিআইসি হিসেবে বিবেচিত হবে। কোনো কোম্পানি ব্যাংকসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ গ্রহণ করলেও সেটি এই কাঠামোর আওতায় আসবে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হলেও দেশের বড় ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নজরদারির আওতায় আনতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি (পিআইসি)’ বিধিমালা প্রণয়ন করছে বিএসইসি। নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করা মূলধন, আয় বা ঋণ থাকা প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোকে এর মাধ্যমে নিয়মের আওতায় আনা হবে। এর ফলে তাদের ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে এবং জনসাধারণের কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ সংগ্রহের প্রবণতা বন্ধ হবে
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, পিআইসিভুক্ত কোম্পানিগুলোকে পরবর্তী ধাপে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হবে। বড় আকারের কোম্পানিগুলোকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে এবং ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনে উৎসাহিত করা হবে। এছাড়া ডিরেক্ট লিস্টিং বা সরাসরি তালিকাভুক্তির ব্যবস্থাও থাকবে। জনসাধারণের কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ সংগ্রহের প্রবণতা বন্ধ করতে ‘প্রাইভেট প্লেসমেন্ট’-এর ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ২০ জনে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পিআইসি হিসেবে চিহ্নিত কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন, পরিচালনা পর্ষদের তথ্য ও বার্ষিক প্রতিবেদন নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। এই ওয়েবসাইটকে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি)-এর ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। এছাড়া তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া সহজ করতে ডিজিটাল অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করবে বিএসইসি।
পিআইসিভুক্ত কোম্পানিগুলোকে পরবর্তী ধাপে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আইপিও বা কিউআইও-র মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংক নির্ভরতা কমবে। এছাড়াও পিআইসি হিসেবে চিহ্নিত কোম্পানিগুলোকে পেশাদার স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার মতো সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, যা তাদের আরজেএসসি-র ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে
পিআইসিভুক্ত কোম্পানিগুলোকে পরবর্তী ধাপে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আইপিও বা কিউআইও-র মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংক নির্ভরতা কমবে। এছাড়াও পিআইসি হিসেবে চিহ্নিত কোম্পানিগুলোকে পেশাদার স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার মতো সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, যা তাদের আরজেএসসি-র ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে
বর্তমানে ২০১৯ সালের একটি বিশেষ ছাড়ের কারণে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বিএসইসির অনুমোদন ছাড়াই মূলধন বাড়াতে পারে। নতুন বিধিমালায় এই ছাড় রহিত করে মূলধন বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরজেএসসির পাশাপাশি বিএসইসির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এতে মূলধন কাঠামো ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর প্রবণতা এবং অর্থ ছাড়াই প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু বন্ধ হবে বলে মনে করছে কমিশন।
বিএসইসি’র একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিধিমালার বিষয়ে ঢাকা পোস্টকে জানান, তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বহুজাতিক, সরকারি এবং দেশীয় ভালো প্রাইভেট-পাবলিক কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার কাজ চলছে। এর ধারাবাহিকতায় জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে একটি নিয়মের আওতায় আনতে পিআইসি বিধিমালা তৈরি করছে কমিশন। নতুন এই নিয়মে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আসামাত্রই জনসাধারণের সঙ্গে মালিকানা ভাগাভাগি করতে বাধ্য হবে। এজন্য তাদের আইপিও বা যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার ইস্যু করতে হবে, অথবা ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে বাজারে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে কোম্পানির মূলধন, বার্ষিক আয় এবং ঋণের পরিমাণ মূল্যায়নে পিআইসি রুলস অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক হবে। কোম্পানিগুলো তাদের মূলধন বাড়াতে চাইলে শুধুমাত্র আরজেএসসির অনুমোদন নিয়ে চলবে না, বিএসইসিরও অনুমোদন নিতে হবে। এছাড়া বোর্ডে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকা বাধ্যতামূলক করা হবে। ওয়েবসাইটে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়মিত আপডেট করতে হবে এবং আরজেএসসির ওয়েবসাইটের সঙ্গে তা সংযুক্ত থাকবে। অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নতুন বিধিমালায় এমন সব প্রশাসনিক নিয়ম মেনে চলতে হবে।

বিধিমালাটি শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানি বাড়াবে
বিশ্লেষক ও বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শেয়ারবাজারে ভালো মানের কোম্পানির সংখ্যা বাড়বে এবং বাজারের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি, কোম্পানিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে এটি শেয়ারবাজারের গুরুত্ব বাড়াতে সহায়তা করবে।
এ বিষয়ে শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘পিআইসি বিধিমালা নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সাধারণত শেয়ারবাজারের মাধ্যমেই হয়। কিন্তু বাংলাদেশে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি— উভয় ধরনের অর্থায়নই ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর নির্ভরশীল। পিআইসি বিধিমালাটি বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংকের ওপর এই নির্ভরতা কমে আসবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, কোনো কোম্পানি পিআইসিভুক্ত হলেই তাকে শেয়ারবাজারে বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাভুক্ত করা যাবে না। কোম্পানিটি কত বছর ধরে ব্যবসা করছে এবং তার আর্থিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী— এসব বিষয় মূল্যায়ন করেই তাকে বাজারে আনতে হবে। যেহেতু অনেক ভালো কোম্পানি স্বেচ্ছায় শেয়ারবাজারে আসতে চায় না, তাই সেগুলোকে বাজারে আনতে পিআইসি বিধিমালাটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করার আগে ইস্যুয়ার কোম্পানিগুলোর (যারা শেয়ার ছাড়তে পারে) সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও সুমিত পোদ্দার। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, পিআইসিভুক্ত মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে যদি শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করা যায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে। এক্ষেত্রে বিধিমালাটি প্রণয়নের আগে এটি দেখতে হবে যে তা ইস্যুয়ারবান্ধব হচ্ছে কি না। প্রয়োজনে বড় ইস্যুয়ার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা উচিত। যেহেতু তাদের জন্যই এই বিধিমালা, তাই তাদের কোন কোন জায়গায় সমস্যা হতে পারে, তা আগে আলোচনা করে নিলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।
শিগগিরই জনমত যাচাই করা হবে
শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি-র পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, পিআইসি বিধিমালাটি ইতোমধ্যে কমিশন সভায় প্রস্তাব হিসেবে উত্থাপন করা হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত করার আগে কিছু কাজ এখনও বাকি রয়েছে। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে বিধিমালাটি চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে। এজন্য শিগগিরই বিএসইসি-র ওয়েবসাইট ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জনমত আহ্বান করা হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবার মতামত নিয়ে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা হলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানিগুলো একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী হবে।
এমএমএইচ/এমএআর/
