বিজ্ঞাপন

একনেকে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প পাস

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ও কৃষি রক্ষায় ৩৩ হাজার কোটি টাকার মেগা উদ্যোগ

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ও কৃষি রক্ষায় ৩৩ হাজার কোটি টাকার মেগা উদ্যোগ

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় মৃত নদীগুলোতে প্রাণ ফেরানো এবং কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল বাংলাদেশ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিশাল ব্যয়ের ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। আজ (বুধবার) শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এই মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়।

উপকূলীয় ১৯টি জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই উদ্যোগকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। দেশের সামগ্রিক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে এটি বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একনেক সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়, যার মধ্যে ১১ নম্বর কার্যতালিকায় ছিল এই পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।

কমিশন জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে এবং উপকূলীয় জেলাগুলোতে লবণাক্ততার প্রভাব উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। সরকারের এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে মৃতপ্রায় নদীগুলোতে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। সত্তরের দশকে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে গঙ্গার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা ও বড়ালের মতো নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ার ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও কৃষি উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে দেশ ও পরিবেশকে বাঁচাতে সরকার দুই পর্যায়ে মোট ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার প্রথম ধাপ একনেক সভায় পাস হলো।

প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে হওয়া গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। এমন এক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজটি নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট এবং একটি নেভিগেশন লক। ব্যারাজের ওপর দিয়ে রেলওয়ে সেতু নির্মাণের পাশাপাশি প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সংস্থান রাখা হয়েছে, যা কোনো জ্বালানি ছাড়াই সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ নিশ্চিত করবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় হিসনা-মাথাভাঙ্গা ও গড়াই-মধুমতি নদী সিস্টেমের কয়েকশ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রথম পর্যায়ে মূল ব্যারাজের অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পুনঃখনন কাজ শেষ হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী সিস্টেম পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা দিয়ে ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে। ফলে বছরে অতিরিক্ত ২৩ দশমিক ৯০ লাখ টন ধান এবং ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রতি বছর দেশ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল পাবে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সুফল পাবে দেশের ৪টি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা। এর মধ্যে খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যারাজটি নির্মিত হলে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নৌ-চলাচল ও সুপেয় পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত হবে। যদিও বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা নদীর গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন ও পলি জমার মতো পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রকল্পটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় এক নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।

এসআর/বিআরইউ