বিজ্ঞাপন

ডিআইজির নামে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে চালাতেন ব্র্যাক ব্যাংক কর্মকর্তা

ডিআইজির নামে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে চালাতেন ব্র্যাক ব্যাংক কর্মকর্তা

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তার অজান্তে ৫ লাখ টাকা সীমার একটি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করা হয়। এরপর বছরের পর বছর সেই কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন চালিয়ে যান ব্যাংকেরই এক কর্মকর্তা। বিস্ময়করভাবে পুরো সময়জুড়ে বিষয়টি শনাক্ত করতে পারেনি দেশের অন্যতম বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি। শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী কর্মকর্তা নিজের সিআইবি রিপোর্টে ঋণখেলাপির তথ্য দেখতে পাওয়ার পর ফাঁস হয় আলোচিত এই জালিয়াতি।

ঘটনার ভুক্তভোগী ডিআইজি মো. মাহমুদুর রহমান, যিনি বর্তমানে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)-তে দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিনি বর্তমান ডিএমপি কমিশনারের ব্যাচমেট এবং ভবিষ্যতে এসবির প্রধান হওয়ার সম্ভাব্য কর্মকর্তাদের একজন হিসেবেও আলোচনায় রয়েছেন। এমন একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার নামে জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসার পর পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়েও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

এ ঘটনায় ব্র্যাক ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেনকে (৪০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রাজধানীর জোয়ার সাহারা এলাকার বাসিন্দা সারোয়ারকে তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ৮ জুন গুলশান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডিআইজি মো. মাহমুদুর রহমানের ব্যক্তিগত তথ্য ও নথিপত্র ব্যবহার করে তার অজান্তেই ৫ লাখ টাকা সীমার একটি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করেন ব্র্যাক ব্যাংকের তৎকালীন কার্ড সেলস বিভাগের কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেন। ২০১৭ সালে কার্ডটি ইস্যু করার পর ব্যাংকের রেকর্ডে নিজের মোবাইল নম্বর ও ভুয়া ঠিকানা যুক্ত করে দীর্ঘ ৫ বছর (২০১৭-২০২২) সেটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবহার করেন ওই ব্যাংক কর্মকর্তা। এই সময়ে কার্ডটির মাধ্যমে মোট ১৭ লাখ ৭০ হাজার ২১৩ টাকার লেনদেন করা হয়, যার মধ্যে সুদ ও অন্যান্য চার্জসহ ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৫ টাকা পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করা হয়।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, সারোয়ার হোসেন ব্র্যাক ব্যাংকের কার্ড সেলস বিভাগের সিনিয়র রিলেশনশিপ অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকাকালে ২০১৭ সালে ডিআইজি মাহমুদুর রহমানের কাছ থেকে ক্রেডিট কার্ড দেওয়ার কথা বলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করেন। কিন্তু পরে সেই নথিপত্র ব্যবহার করে পাঁচ লাখ টাকা লিমিটের একটি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করলেও সেটি কখনো প্রকৃত গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়নি। বরং প্রতারণার উদ্দেশ্যে ব্যাংকের রেকর্ডে নিজের মোবাইল নম্বর এবং ভুয়া ঠিকানা যুক্ত করেন সারোয়ার। ফলে কার্ডটির যাবতীয় ওটিপি, ভেরিফিকেশন কোড ও অন্যান্য নিরাপত্তা বার্তা সরাসরি তার মোবাইল ফোনে আসতে থাকে। এ সুযোগে তিনি দীর্ঘদিন কার্ডটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবহার করেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ওই কার্ড ব্যবহার করে মোট ১৭ লাখ ৭০ হাজার ২১৩ টাকার লেনদেন করা হয়। এর মধ্যে ১৪ লাখ টাকার বেশি পরিশোধ করা হলেও সুদ ও অন্যান্য চার্জসহ ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৫ টাকা ব্যাংকে পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করা হয়। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সময়জুড়ে ব্যাংকের কোনো পর্যায়েই জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়েনি।

সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একজন গ্রাহকের নামে ইস্যুকৃত ক্রেডিট কার্ডে ভিন্ন মোবাইল নম্বর সংযুক্ত করে বছরের পর বছর লেনদেন চললেও তা ব্যাংকের নজরদারি ব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ব্র্যাক ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও গ্রাহক তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল।

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি সামনে আসে যখন ডিআইজি মাহমুদুর রহমান অন্য একটি আর্থিক কার্যক্রমের জন্য আবেদন করতে গিয়ে নিজের সিআইবি রিপোর্টে ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত তথ্য দেখতে পান। অথচ তিনি কখনো ওই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেননি কিংবা কোনো ঋণও গ্রহণ করেননি। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে লিখিত অভিযোগ করেন।

এরপর শুরু হয় অনুসন্ধান। ব্র্যাক ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, সারোয়ার হোসেন গ্রাহকের নথিপত্র ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে কার্ডটি তৈরি করেছিলেন এবং প্রকৃত গ্রাহকের অজান্তেই নিজে তা ব্যবহার করে আসছিলেন।

দীর্ঘদিন ধরে এই জালিয়াতি চললেও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা তা শনাক্ত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ডিআইজি মাহমুদুর রহমান অন্য একটি আর্থিক কাজের জন্য আবেদন করতে গিয়ে নিজের সিআইবি রিপোর্টে ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণখেলাপির তথ্য দেখতে পান। এরপর তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে লিখিত অভিযোগ করেন এবং গত এপ্রিল মাসে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তভার পাওয়ার পর তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ৮ জুন গুলশান এলাকা থেকে অভিযুক্ত সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

এ বিষয়ে সিআইডির ঢাকা মেট্রো (ওয়েস্ট) অঞ্চলের অতিরিক্ত ডিআইজি জয়নুল আবেদীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি কর্মস্থলের গ্রাহকের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ব্যবহার করে একটি ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করেছেন। কোনো গ্রাহক হয়তো কার্ড নিতে আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু তার নথিপত্র ফেরত না দিয়ে নিজের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে কার্ড ইস্যু করে নেন। ফলে সব ওটিপি তার কাছেই যেত। এভাবে তিনি প্রায় ১৭ লাখ ৭০ হাজার টাকার লেনদেন করেন এবং পরে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ বন্ধ করে দেন।

তিনি বলেন, ব্যাংক যখন প্রকৃত গ্রাহককে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন ওই গ্রাহক জানতে পারেন তার ব্যক্তিগত কাগজপত্র ব্যবহার করে প্রতারণা করা হয়েছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যাংক ছেড়ে অন্যত্র চলে যান এবং দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন।

ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা ও নিরাপত্তা প্রশ্ন

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো (ওয়েস্ট) অঞ্চলের উপ-পরিদর্শক (এসআই) নিউটন কুমার দত্ত ঢাকা পোস্টকে বলেন, এটি ব্র্যাক ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির একটি ঘটনা। অভিযুক্ত কর্মকর্তা ব্যাংকের হেড অফিসের কার্ড সেকশনে কর্মরত থাকাকালে অন্য একজনের স্বাক্ষর জাল করে নিজের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে কার্ডটি চালু করেন।

তিনি বলেন, একজন ডিআইজির নামে পাঁচ লাখ টাকা সীমার একটি ক্রেডিট কার্ড বছরের পর বছর ব্যবহার করা হয়েছে, অথচ ব্যাংক বিষয়টি বুঝতেই পারেনি। এটি ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

তদন্তে আরও জানা গেছে, সারোয়ার হোসেন চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময়ও ব্যাংকে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি ব্র্যাক ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করে একটি বায়িং হাউস প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। তবে চাকরি ছাড়ার পরও তার প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী কর্মকর্তা গত এপ্রিল মাসে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার তদন্তভার পরবর্তীতে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সিআইডি জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সারোয়ার হোসেন জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে অপরাধে ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একই ধরনের প্রতারণা করেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে বছরের পর বছর আর্থিক প্রতারণা চালানো এবং সেটি ব্যাংকের নজরদারির বাইরে থাকা দেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রাহক তথ্য নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে একজন এসবি ডিআইজির মতো উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাও যদি এমন জালিয়াতির শিকার হন, তাহলে সাধারণ গ্রাহকদের তথ্য কতটা নিরাপদ সেই প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে।

এমএসি/বিআরইউ