দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে আসন্ন বাজেটে বড় ধরনের করছাড়ের পরিকল্পনা করেছে সরকার। কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যবসায়ী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বস্তি দিতে বিভিন্ন খাতে করের হার হ্রাস, ভ্যাট কমানো এবং ক্ষেত্রবিশেষে সম্পূর্ণ কর অব্যাহতির ঘোষণা আসতে পারে আগামী বাজেটে। এর মধ্যে প্রযুক্তি-নির্ভর খাত ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও স্টার্টআপ বড় ধরনের করছাড়ের আওতায় আসতে পারে।
অন্যদিকে, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে বিশেষ করছাড় দেওয়া হতে পারে। নির্ধারিত সময় অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে করদাতাদের জন্য ৫ শতাংশ হারে করছাড়ের সুযোগ রাখা হচ্ছে আসন্ন বাজেটে। তবে, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা চাইলে সারা বছরই রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
সার্বিক বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, একটি সঠিক ও দূরদর্শী করনীতি প্রণীত হলে দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মসংস্থান বাড়বে। এবারের মূল লক্ষ্যই হলো করের বোঝা চাপানো নয়, বরং করের আওতা বাড়িয়ে অর্থনীতিকে মানবিক ও গতিশীল করা।
ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনে করছাড়
দেশে প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং খাত। তরুণদের এই সম্ভাবনাময় খাতে আরও উৎসাহিত করতে ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত সব ধরনের আয়কে সম্পূর্ণ কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হতে পারে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘কনটেন্ট ক্রিয়েশন’ (ভিডিও ও তথ্য উপাদান তৈরি) থেকে আসা আয়কেও করমুক্ত ঘোষণার প্রস্তাব করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

স্টার্টআপ ও এসএমই খাতে বিশেষ প্রণোদনা
নতুন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখতে স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার কর শূন্য (০%) করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সাধারণ এসএমই উদ্যোক্তাদের সুবিধার্থে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের সুরক্ষায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের আয় করমুক্ত রাখা হতে পারে। আর নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের ওপর অর্জিত আয়কে সম্পূর্ণ করমুক্ত করার প্রস্তাব আসতে পারে।
ঢাকার বাইরে বিনিয়োগে বড় অবচয় সুবিধা
সারাদেশে সুষম শিল্পায়নের লক্ষ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে যেকোনো উৎপাদনমুখী শিল্প, পর্যটন বা ক্রীড়াক্ষেত্রের স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ অবচয় সুবিধা দেওয়া হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই বিনিয়োগের ওপর প্রথম বছরে ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ হারে অবচয় সুবিধা পাবেন উদ্যোক্তারা, যা তাদের প্রাথমিক ব্যবসায়িক খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দানে মিলবে কর রেয়াত
রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে করদাতাদের দানে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধী সেবা, ক্যানসার, অটিজম, ডায়াবেটিস, থ্যালাসেমিয়া ও সামাজিক কল্যাণে নিয়োজিত নির্দিষ্ট ১১টি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। এসব সংস্থায় দান করলে করদাতারা বিশেষ কর রেয়াত সুবিধা পেতে পারেন।
পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাতে কর সুবিধা
পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে বেল্ট টাইপ সার অপসারণ মেশিন, হ্যাচারি মেশিন, সেটার মেশিন, আর্দ্রতা সেন্সর এবং তাপমাত্রা সেন্সরে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হতে পারে। এর ফলে এই খাতের খামারিদের উৎপাদন খরচ কমে আসবে, পণ্যের দাম কমবে এবং দেশের পুষ্টির চাহিদা পূরণ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরএম/এমএআর
