আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য বিদ্যমান করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। এই সুবিধা ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য প্রযোজ্য হবে।
একই সঙ্গে দেশে প্রথমবারের মতো ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি আয়কর রোডম্যাপ ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং করদাতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩০-৩১ করবর্ষ পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমা ও করহার আগাম নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে এবারের বাজেটে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য বিদ্যমান ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হবে। পরবর্তী দুই করবর্ষ অর্থাৎ ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ করবর্ষে তা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত হবে এবং চূড়ান্ত ধাপে ২০৩০-৩১ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্যও করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নারী করদাতা এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী প্রবীণ নাগরিকদের (সিনিয়র সিটিজেন) জন্য করমুক্ত আয়সীমা ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আর তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে যথাক্রমে ৫ লাখ, ৫ লাখ ২৫ হাজার এবং ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে।
একইভাবে গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং গণঅভ্যুত্থানের গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য করমুক্ত আয়সীমা ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া, প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা-মাতা বা আইনানুগ অভিভাবকদের জন্যও বিশেষ আর্থিক সুবিধা রাখা হয়েছে। প্রত্যেক প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্যের (ডিপেন্ডেন্ট) জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা আয় করমুক্ত হিসেবে গণ্য হবে।

রোডম্যাপে করদাতার করহার
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য আগামী পাঁচ বছরের করহারও আগাম নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের জন্য বিদ্যমান প্রগতিশীল করব্যবস্থা বহাল থাকলেও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর তুলনামূলক বেশি কর আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষে প্রথম ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকবে। পরবর্তী ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। সবমিলিয়ে ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের জন্য সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকবে। এর বেশি আয় হলে অবশিষ্ট অংশের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে।
অন্যদিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে করস্ল্যাবগুলো অপরিবর্তিত থাকলেও উচ্চ আয়ের করদাতাদের জন্য নতুন একটি স্তর বা স্ল্যাব যুক্ত করা হয়েছে। এ সময় প্রথম ৪ লাখ টাকা করমুক্ত থাকবে। পরবর্তী ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে। এরপর ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। তবে, বছরে ৩ কোটি টাকার বেশি আয় হলে অতিরিক্ত অংশের ওপর সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে।
২০৩০-৩১ করবর্ষেও একই ধরনের কাঠামো বহাল থাকবে। তবে, করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হবে। এরপর একই ধাপ অনুযায়ী ১০, ১৫, ২০ ও ২৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে। ২ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে করহার থাকবে ৩০ শতাংশ এবং ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন কাঠামোর মাধ্যমে একদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া হবে, অন্যদিকে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করা হবে। এর ফলে করব্যবস্থাকে আরও প্রগতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করা সম্ভব হবে। দীর্ঘমেয়াদি কর রোডম্যাপ ঘোষণাকে তারা করব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনার একটি অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
আরএম/এমএআর
