২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এক বিশাল অঙ্কের ঘাটতি মাথায় নিয়ে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এই প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সংসদে পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট। এছাড়া, বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এটিই প্রথম বাজেট উপস্থাপন।
নিয়ম অনুযায়ী, সংসদে উপস্থাপনের আগে বাজেটটি বিশেষ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হবে এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এতে সম্মতি জানিয়ে স্বাক্ষর করবেন। আগামী ১ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে নতুন এই অর্থবছর।
প্রস্তাবিত বাজেটের আয়-ব্যয়ের এই বিশাল ঘাটতি পূরণে নতুন অর্থমন্ত্রী যে সুনির্দিষ্ট ছক এঁকেছেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো—
রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা। কর-বহির্ভূত ও অন্যান্য আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া, কর ছাড়া প্রাপ্তি (নন-ট্যাক্স রেভিনিউ) ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক অনুদান থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
ঘাটতি ও অর্থায়নের ছক
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ (অনুদান ছাড়া) ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা প্রাক্কলিত মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আর অনুদানসহ এই ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশাল এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—উভয় উৎসের ওপরই ভরসা করছে।

ছক অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান খাত থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সিংহভাগ অর্থাৎ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকাই নেওয়া হবে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। এছাড়া, জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকাসহ মোট ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য স্থির করেছে সরকার।
বৈদেশিক ঋণের হিসাব ও সংশয়
ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে সরকার বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান আহরণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ নেওয়া হবে। সেখান থেকে পূর্বের বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ৪৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে। ফলে সরকারের নিট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকার বিদেশি অনুদান যুক্ত হয়ে এই খাত থেকে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা আসবে।
তবে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
এদিকে, চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল সরকার। কিন্তু অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই (জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত) সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেলেছে, যা ইতোমধ্যে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে।

জিডিপি, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। ফলে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি লাগাম টেনে ধরা এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ বাড়ানোই হবে আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের বিশাল ঘাটতি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ১০ মাসে (জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এই সময়ে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এই ১০ মাসে প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ অর্জিত হলেও, অর্থবছর শেষ হতে বাকি থাকা অল্প সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে হলে আরও প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে— যা বর্তমান বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসআই/এমএআর/
