আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণসহ বেশ কিছু লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা হয়েছে, যেগুলো আরেকটু বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, এই লক্ষ্যমাত্রা যদি বাস্তবসম্মত না হয়, তখন সেটি বাস্তবায়নও সম্ভব হয় না। আর যখনই এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করা যায় না, তখনই বাজেটের শৃঙ্খলাটা নষ্ট হয়। তখন বাজেটে কোথা থেকে আয় আসবে, কোথায় ব্যয় হবে, এমন অনেক শৃঙ্খলার অভাব দেখা দেয়।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত তাৎক্ষণিক এক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানসহ প্রতিষ্ঠানটির আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রথমে আমরা সিপিডির পক্ষ থেকে বলতে চাই যে, এটি আমাদের সংক্ষিপ্ত বাজেট প্রতিক্রিয়া। আগামীকাল আমরা সিপিডির পক্ষ থেকে বাজেটের আরও বিস্তারিত মূল্যায়ন তুলে ধরব। সুতরাং আজকের এই প্রতিক্রিয়া আমাদের কোনো গভীর বিশ্লেষণ নয়। আমরা এখানে আমাদের কয়েকটি অবজার্ভেশন তুলে ধরব।
তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী এবং তার টিম মাত্র চার মাসের মধ্যে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছেন যেটি একটি দুরূহ কাজ। এজন্য আমরা সিপিডির পক্ষ থেকে তাকে এবং তার টিমের ধন্যবাদ ও আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, আমরা জানি যে বাজেটটি এমন একটি সময় হয়েছে, যখন অর্থনীতি বিভিন্নভাবে চাপের মুখে। যখন শুধু প্রবৃদ্ধিই নয়, স্থিতিশীলতা, আস্থা ও সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনার প্রয়োজন রয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে কয়েকটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই বাজেটটি করা হয়েছে বলে আমাদের কাছে মনে হয়। যেটি কঠিন বিষয় সেটি হলো- একদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, অন্যদিকে কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগকে পুনুরুজ্জীবিত করা। সবচেয়ে আগে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপটা কমাতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা দেখেছি বাজেটের যে মূল মূল লক্ষ্যগুলো, যেমন- অর্থনীতি স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগ নির্ভর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এবং অনেক দিক থেকেই নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহারে যেই বিষয়গুলো ছিল, সেই বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থনীতির গণতান্ত্রিকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বেসরকারি খাত নির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সুশাসনের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মোটা দাগে কয়েকটি বিষয়ে বলবো, সেটি হলো বাজেটের যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো, সেখানে বাজেটে প্রবৃদ্ধি হার সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির সাড়ে ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে যে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে, সেটির সঙ্গে আরো প্রায় দেড় শতাংশ বৃদ্ধি, এটা কিছুটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা মনে হতে পারে। তবে একটা বিষয় যে আমাদের অর্থনীতির আকার অনেক বড় এবং জনসংখ্যাও অনেক বেশি, সেই দিক বিবেচনায় আমরা এই অর্জন করতে পারি।
তিনি বলেন, আমরা প্রবৃদ্ধি অর্জন ৫ শতাংশ থেকে যদি সাড়ে ৫ শতাংশ কিংবা ৬ শতাংশও করতে চাই, সেক্ষেত্রেও কিছু পূর্ব শর্ত রয়েছে। সেগুলো হলো- বেসরকারি বিনিয়োগে গতিশীলতা আনা, শিল্পের উৎপাদন বাড়ানো এবং রপ্তানিতে গতিশীলতা আনতে হবে। কেননা বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি যে অবস্থায় রয়েছে কিংবা আর্থিক খাতে যে দুর্বলতা রয়েছে এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে আমাদের এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করাটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
সিপিডির এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, মূল্যস্ফীতি বর্তমানের প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ নামিয়ে আনতে হলে সেটারও কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে আমাদের টাকার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার হার স্থিতিশীল করা, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ও কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মুদ্রানীতিকে যথাযথভাবে পরিপালন করতে হবে। আমরা এখন সংকোচনমূলক একটি মুদ্রানীতি অনুসরণ করছি। আমরা জানি যে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য একটা চাপ রয়েছে এবং সেটি বাস্তবায়ন করার জন্যই বিচক্ষণ পলিসি নেওয়া উচিত। পাশাপাশি রাজস্ব নীতি সমন্বয় করারও একটি বিষয় রয়েছে।
‘যদিও আমাদের বর্ধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা কিংবা রাজস্ব ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমরা যদি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারি। ব্যয় করে যদি আমরা তার বিপরীতে আয় বাড়াতে পারি, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারি এবং সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করতে পারি তাহলে এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তবে মনে রাখতে হবে যে এখানে আন্তর্জাতিক বাজারেরও একটা বিষয় থাকতে পারে, যেমন- তেলের মূল্যবৃদ্ধি। এক্ষেত্রে তেলের দাম বর্তমান অবস্থা থাকলে এবং ওই শর্তগুলোকে যদি আমরা পরিপালন করতে পারি, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে’, যোগ করেন তিনি।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, আমাদের রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থায় ঐতিহাসিকভাবে ব্যর্থতা-দুর্বলতা রয়েছে। প্রতি বছরই চাহিদা অনুযায়ী একটি উচ্চমাত্রা রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। কিন্তু সেটি আমরা অর্জন করতে পারি না।
এমএমএইচ/এমএন
