বিজ্ঞাপন

এমসিসিআই

সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আহরণের চেষ্টা করদাতাদের ওপর হয়রানি বাড়বে

সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আহরণের চেষ্টা করদাতাদের ওপর হয়রানি বাড়বে

প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টা করলে করদাতাদের ওপর হয়রানি বাড়তে পারে বলে মনে করছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)।

সংগঠনটির মতে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে, তা উচ্চাভিলাষী। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই লক্ষ্যমাত্রা ১৮ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি, যা বাস্তবায়ন অযোগ্য।

জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে শুক্রবার (১২ জুন) গণমাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটি এ মন্তব্য করে।

এমসিসিআই মনে করে, অতিরিক্ত কর আরোপ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ কার্যকর হলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করে সংগঠনটি।

ব্যবসায়ীদের এই সংগঠনটির মতে, বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য করনীতি সংস্কার, কর প্রশাসনের অটোমেশন, সিস্টেম, লস হ্রাস, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় অধিকতর গতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে করনেট সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আইএমএফ-এর শর্ত পূরণে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা যেন করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি না করে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এছাড়া দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে এমসিসিআই উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর মধ্যে সরকারি বিনিয়োগ ছয় দশমিক ৪০ শতাংশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বিনিয়োগ হ্রাসের ফলে কর্মসংস্থান কমছে এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে।

দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তিন লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক হলেও, এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দুর্বল রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ বলে এমসিসিআই মনে করে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়কালে রাজস্ব আহরণ হয়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশ এবং এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে এমসিসিআই স্বাগত জানায়। বিশেষ করে বাংলা বিজ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সেবা, এফটিএ, পিটিএ ও ইপিএ চুক্তি সম্প্রসারণ এবং ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ-২০২৬’ শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে চেম্বার মনে করে।

নতুন কোনো করহার বৃদ্ধি না করে করের আওতা সম্প্রসারণের নীতিকে এমসিসিআই সমর্থন করে। একই সঙ্গে, ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কর প্রশাসনের কাঠামোগত ও ডিজিটাল সংস্কার অপরিহার্য বলে চেম্বার মনে করে।

এমসিসিআই উৎসে করসংক্রান্ত প্রস্তাবিত সংস্কারকে স্বাগত জানায়, কারণ বর্তমান আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয়ের ওপর উৎসে কর কর্তন না করলে সম্পূর্ণ ব্যয়কে 'অননুমোদন যোগ্য' হিসেবে গণ্য করে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর-দায় আরোপ করা হতো। প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিধান সংশোধন করে সম্পূর্ণ ব্যয়কে অননুমোদন যোগ্য ঘোষণা করার পরিবর্তে শুধু বকেয়া উৎসে কর এবং তার ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা কর ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করবে এবং অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত কর ঝুঁকি হ্রাস করবে।

তবে এমসিসিআই কোম্পানির ন্যূনতম টার্নওভার কর যৌক্তিকীকরণ বা হ্রাসে কোনো পদক্ষেপ না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এছাড়া, ন্যূনতম টার্নওভার কর শুধু ক্যারি ফরওয়ার্ড করা যায়, কিন্তু ফেরত প্রদানের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় লাভ না করেও টার্নওভারের ভিত্তিতে কর প্রদানের এই বাধ্যবাধকতা ব্যবসার নগদ প্রবাহ, পুনর্বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে চেম্বার মনে করে।

ব্যক্তিগত করদাতাদের প্রকৃত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত, মধ্যবিত্ত ও সৎ করদাতাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। একদিকে সর্বনিম্ন করহার পাঁচ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ রেয়াতের সুযোগ সংকুচিত করা হয়েছে, যা নিয়মিত কর প্রদানে অনীহা সৃষ্টি করতে পারে।

মেট্রোপলিটন চেম্বার জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ এবং নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারের ঘোষিত ১০টি অগ্রাধিকার অত্যন্ত সময়োপযোগী।

সংগঠনটি বলছে, বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জপূর্ণ বাস্তবতার মধ্যে এ বাজেট প্রণয়ন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল দায়িত্ব।

এমএমএইচ/জেআই/এমএন

বিজ্ঞাপন