চলমান ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আন্দোলনের অংশ হিসেবে সচেতন গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে নতুন করে ৭ দফা দাবি জানানো হয়েছে। শনিবার (১৩ জুন) বিকেল ৪টার মধ্যে ওই দাবিগুলো মানা না হলে নতুন করে কর্মসূচির ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জনানো হয়েছে।
শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অবৈধ চেয়ারম্যানের অপসারণ, আমানতের সুরক্ষা প্রদান, গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা, লুটেরা এস আলম ও ফ্যাসিস্টের দোসরদের বয়কট এবং গ্রাহকদের উপর নির্মম পুলিশি হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র অধ্যাপক নুর উন-নবী মানিক এই ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক নুর উন-নবী মানিক বলেন, আমাদের দাবি সুস্পষ্ট, অবিলম্বে খোরশেদ আলমকে অপসারণ করে ব্যাংকিং ক্ষেত্রে দক্ষ, সৎ, পেশাদার ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে হবে। এস আলম ও ফ্যাসিস্টের দোসর কাউকে ইসলামী ব্যাংকে ঢুকতে দেওয়া হবে না, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না, ইসলামী ব্যাংক দখলের পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে। আমাদের ৭ দফা দাবি পূরণ না হলে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে এবং এ ক্ষেত্রে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকারকেই দায়ী থাকতে হবে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা। সেখানে উপস্থাপিত প্রতিটি তথ্য জনগণ সত্য ও নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করে। প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্যগত অসামঞ্জস্যপূর্ণতা শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের সুনাম নয়, সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, সত্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থে এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা হবে এবং প্রয়োজনে তথ্যগত সংশোধন করা হবে।
ফোরামের আহ্বায়ক আরো বলেন, আজ বিকেল ৪টার মধ্যে আমাদের ৭ দফা দাবি না মানলে রোববার (১৪ জুন) ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। পাশাপাশি মঙ্গলবার (১৬ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো লিখিত ৭ দফা দাবিগুলো হলো-
১. অনতিবিলম্বে দুর্নীতিবাজ, ফ্যাসিবাদ ও ডাকাত এস আলমের দোসরকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে অপসারণ করে ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিকে বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করতে হবে।
২. যাদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো বন্দুকের মুখে দখল করেছিল তাদেরকে ফেরত দিতে হবে। কারণ ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন স্বাভাবিক উপায়ে ছিল না। ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগিতায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপে জোরপূর্বক পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করিয়ে মালিকানা দখল করা হয়। সুতরাং যাদের কাছ থেকে ব্যাংক লুটেরা ও মাফিয়া দখল করেছিল তাদেরকে মালিকানা ফেরত দিতে হবে। প্রকৃত মালিকদের কাছেই এই ব্যাংক নিরাপদ।
৩. ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করতে হবে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ বিভিন্ন ব্যাংক ফ্যাসিস্ট হাসিনা এবং তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় এস আলমসহ যারা লুট করেছে তাদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ট্রাইবুল গঠন করতে হবে। এই ট্রাইবুনালের মাধ্যমে তাদের দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে বাংলাদেশে এ রকম লুটেরা মাফিয়া গোষ্ঠীর আর জন্ম না হয়।
৪. ইসলামী ব্যাংকগুলোতে আতঙ্ক সৃষ্টি বন্ধ করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে স্থিতিশীলতা আনয়নের জন্য বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে বিরত থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. লুটের অর্থ পুনরুদ্ধারে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত এনে ব্যাংকের দায় পরিশোধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে বিশেষ সেল গঠন করে লুটেরাদের সব স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রির মাধ্যমে ব্যাংকের দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে লুটেরাদের বিচারের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত থেকে কোনো স্থিতাবস্থা যাতে লুটেরা জারি করতে না পারে এ ব্যাপারে সরকারকে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ এই আদালত থেকে এস আলমের ঋণের কোনো অনিয়ম তদন্ত করা যাবে না মর্মে রুলনিশি জারি করা হয়েছিল।
৬. ব্যাংক লুটেরাদের ফেরার পথ রুদ্ধ করতে হবে। ব্যাংক লুটেরাদের বিচার না করে তাদের পুনর্বাসন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে ব্যাংকিং রেজুলেশন আইন ১৮/ক ধারা সংযোজন করে। অবিলম্বে এ ধারা বাতিল করে লুটেরাদের ফেরার পথ রুদ্ধ করতে হবে। তারা যাতে ভিন্ন নামে আবার ব্যাংক দখল করতে না পারে এ জন্য লুটেরাদের সন্তান, স্ত্রী, সুবিধাভোগী এবং যে সব প্রক্সি কোম্পানীর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগ করে অর্থ লুট করেছে তাদেরকে ব্যাংকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।
৭. জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মিথ্যা বক্তব্য ও ডাকাত এস আলমের হাতে ব্যাংক তুলে দেওয়ার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
এমএমএইচ/জেডএস
