বিজ্ঞাপন

বাজেটে প্রত্যাশার কিছুই নেই, তবুও শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরার ইঙ্গিত

বাজেটে প্রত্যাশার কিছুই নেই, তবুও শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরার ইঙ্গিত

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে মোটাদাগে দেশের শেয়ারবাজারের জন্য কোনো ধরনের প্রণোদনা কিংবা করছাড় রাখা হয়নি। বাজারসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের করছাড় চাওয়া হলেও সরকারের প্রস্তাবনায় সেই বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়নি। তা সত্ত্বেও, বাজার অংশীজনরা মনে করছেন আগামী অর্থবছর শেয়ারবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রত্যাশা পূরণের বছর হতে যাচ্ছে।

বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য বছরভিত্তিক করছাড়ের প্রস্তাব না থাকলেও, প্রথমবারের মতো এ বাজেটে বাজার উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা উঠে এসেছে। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এমনও বাজেট উত্থাপন হতে দেখা গেছে, যেখানে তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর পুরো বাজেট বক্তৃতায় শেয়ারবাজার নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারিত হয়নি। অথচ, এবারের বাজেট প্রস্তাবনায় ঠিক তার উল্টোটা ঘটেছে। স্বল্পমেয়াদি করছাড়ের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী কোনো প্রস্তাব না করলেও শেয়ারবাজারকে ‘বেসরকারি বিনিয়োগ হাব’ গড়ে তোলার মতো নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। আর এতেই অংশীজনরা মনে করছেন, আগামী অর্থবছর শেয়ারবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হতে যাচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বাজেট প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমাদের সরকার দেশের অর্থনীতির পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। আমরা ঋণ নির্ভর বিনিয়োগকে ইকুইটিতে রূপান্তর করছি। আমাদের লক্ষ্য বর্তমান ঋণভিত্তিক অর্থনীতি থেকে দূরে সরে এসে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য সরাসরি কোনো করছাড় বা আর্থিক প্রণোদনার প্রস্তাব রাখা হয়নি। তবে অংশীজনদের দাবি অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি সুবিধার বদলে এবার বাজার উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ঋণনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে বিনিয়োগ বা ইকুইটি-ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই বাজেটকে শেয়ারবাজারের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট এবং বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে, যাতে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর চাপ কমে। করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উপকরণের উন্নয়নও চলমান আছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ, স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর কাঠামো প্রণয়ন করা হবে।

দীর্ঘবছর ধরে দেশের শেয়ারবাজারে দৈনদশা বিরাজ করছে। সূচক ও লেনদেন তালিনীতে নেমেছে। বাজারে ছেড়েছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। নতুন বিনিয়োগের পথও বন্ধ রয়েছে। নতুন কোম্পানি টানতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) কিংবা কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফার (কিউআইও) নেই দুই বছরের বেশি সময় ধরে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নতুন ফান্ডের জোগান দিতে রাইট শেয়ার কিংবা রিপিট পাবলিক অফারেও (আরপিও) আনাগ্রহ দেখা গেছে। তাছাড়া, করপোরেট বন্ড বাজার, মিউচুয়াল ফান্ড এবং সুকুকের মতো বিনিয়োগ উপকরণও অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। সর্বোপরি শেয়ারবাজার একটি খাদের কিনারায় অবস্থান করছে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেটে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলছে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, শেয়ারবাজার বর্তমানে যেই অবস্থায় আছে এখানে ভালো কিছু কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা ছাড়া বাজারের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর ভালো কোম্পানি আনতে কিছু করছাড় পাওয়া গেলে ভালো হতো। অবশ্য, বাজেটে সরাসরি সেই ঘোষণা না থাকলেও অনেকগুলো ভালো বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। সরকারের যেহেতু শেয়ারবাজারের উন্নয়নে একটি কমিটমেন্ট আছে, সামনে কি হয় সেটি দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করা উচিত। শেয়ারবাজারে একসময় অনেকগুলো ভালো কোম্পানি ছিল, এখন যেগুলো খারাপ হয়েছে, এতে বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের বিদেশি ইউনিলিভার, নেসলে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও মেটলাইফের মতো কোম্পানিগুলো, দেশীয় ভালো কোম্পানি এবং সরকারি কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে হবে।

ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর থেকে চাপ কমাতে বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিকল্প উৎস তৈরির কথা বলা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড এবং সুকুকের মতো বিনিয়োগ উপকরণগুলোর সম্প্রসারণ করা হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য পৌর বন্ড ইস্যুর কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি মনে করি শেয়ারবাজারকে অর্থনীতি থেকে আলাদা করে দেখার কিছু নেই। বর্তমানে প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ তলানিতে আছে। বিভিন্ন কারণে তাদেরকে অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ, নতুন করে ঋণও নিচ্ছে না। ব্যাংকের প্রাইভেট সেক্টর ঋণ দেওয়ার হার ৬ শতাংশের কাছাকাছি নেমেছে। এখন যদি প্রাইভেট সেক্টর জাগ্রত না হয়, জিডিপির লক্ষ্যমাত্রার যে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে, সেটিও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করলে ব্যাংকের পরিবর্তে শেয়ারবাজার থেকে বড় অংকের বিনিয়োগের পথ উন্মোচন করতে হবে।

এ বিশ্লেষক আরও বলেন, প্রণোদনা দিয়ে হোক কিংবা, যেভাবেই হোক বিদেশি ও দেশীয় ভালো কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ নিতে উৎসাহী করতে হবে। সরকারি কোম্পানিগুলোকেও তালিকাভুক্ত করতে হবে, প্রয়োজনে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। আর পদ্মা ব্রিজ, যমুনা ব্রিজ এবং ঢাকা এয়ারপোর্টের মতো প্রকল্পগুলোর ভ্যালুয়েশন করে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সরকারকে অর্থের জোগান বাড়াতে হবে। তাহলে একদিকে শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়বে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের ওপর ঋণের চাপ কমবে। আমরা এবারের বাজেটে এমন অনেকগুলো উদ্যোগ দেখতে পেয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়ন হলে শেয়ারবাজারে আস্থা বাড়বে বলে মনে করছি।

বাজেট প্রস্তাবনায় শেয়ারবাজারের জন্য কী আছে?

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শেয়ারবাজারকে আরও গভীর, স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও আস্থাভিত্তিক করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এক্ষেত্রে ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্ত হওয়া সহজ করতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনুমোদন ও পরিপালন-সংক্রান্ত অস্পষ্টতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইপিও প্রক্রিয়া সময়নির্ধারিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কথাও জানানো হয়। এতে আইপিও আবেদন দাখিল, আনুষঙ্গিক দলিলাদি, যাচাই-বাছাই, ফি পরিশোধ, সংশোধন ও অনুমোদনের ধাপ অনলাইনে সম্পন্ন করা হবে।

শেয়ারবাজারের লেনদেন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। বর্তমানে শেয়ার বিক্রির জন্য দুই কার্যদিবস অপেক্ষা করতে হলেও, পর্যায়ক্রমে তা ‘টি+শূন্য’ (দিনে কিনে দিনেই বিক্রি) ব্যবস্থায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও শেয়ার বিক্রির অর্থ এক কর্মদিবসের মধ্যে প্রত্যাবাসনের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।

এছাড়া ইস্যুকারী কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করা হবে। পেনশন তহবিল, বিমা প্রতিষ্ঠান, সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি (এএমসি), মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে। কোম্পানির বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করা হবে। আর সরকারি ও বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নে বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো তহবিলসহ বিভিন্ন অর্থায়ন উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল, ব্যাংক, ব্রোকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্যব্যবস্থার সমন্বয় জোরদার কথা বাজেট প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া দেশীয় কোম্পানির জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জের সম্ভাবনা যাচাই এবং নিরীক্ষক, মূল্যায়নকারী, ইস্যু ম্যানেজারসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের প্রফেশনাল লায়াবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক ও লায়াবিলিটি ইনসিওরেন্স প্রবর্তন করার কথা বলা হয়।

এর বাইরে শেয়ারবাজারের লেনদেন প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে লেনদেন নিষ্পত্তির সময় টি+শূন্য বা দিনে কিনে দিনেই বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে। বর্তমানে শেয়ার বা সিকিউরিটিজ কেনার পর তা বিক্রির জন্য দুই কার্যদিবস অপেক্ষা করতে হয়। তবে বৈধ বিদেশি বিনিয়োগের মুনাফা এবং অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের টাকা অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ক্রয় করা শেয়ার বা সিকিউরিটিজ বিক্রয়লব্ধ অর্থ প্রত্যাবাসন ও পুনঃবিনিয়োগের প্রক্রিয়া এক কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।

অংশীজনদের প্রত্যাশা ও প্রতিক্রিয়া

শেয়ারবাজারের অংশীজনদের মধ্যে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ), মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের করছাড়সহ অনেকগুলো প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো ছিলো- তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত করপোরেট করহারের ব্যবধান ন্যূনতম ১০ শতাংশ করা, ভালো কোম্পানি আনতে আইপিও পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া, দ্বৈত কর প্রত্যাহার, মূলধনী মুনাফার ওপর কর প্রত্যাহার এবং এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত হওয়া পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য কোম্পানিগুলোকে সম্পূর্ণরূপে কর অব্যাহতি দেওয়া। তবে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেটে অংশীজনদের এই প্রস্তাবগুলো মোটেই গুরুত্ব পায়নি।

তা সত্ত্বেও বাজেট প্রস্তাবনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকায় এটিকে শেয়ারবাজারের জন্য উন্নয়নমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব উল্লেখ করে প্রধান অংশীজন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে শেয়ারবাজারের উন্নয়নে সহায়ক নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ডিএসই মনে করে, শেয়ারবাজারের প্রতি সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংস্কারমুখী পদক্ষেপ দেশের ক্রমবিকাশমান শেয়ারবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ প্রেক্ষাপটে, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও টেকসই শেয়ারবাজার গড়ে তুলতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রস্তাবিত বাজেটকে অভিনন্দন ও স্বাগত জানিয়ে এক বার্তায় ডিবিএর পক্ষ থেকে বলা হয়, শেয়ারবাজার সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের জন্য একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক শেয়ারবাজার গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার এবারের বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

সংগঠনটি আরও জানায়, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট, সীমিত বিনিয়োগ পণ্য এবং ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের চাপে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারকে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে নীতিগত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে বাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন উদ্যোক্তারা মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবেন এবং কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা কে কী বলছেন?

মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বিএমবিএর সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুমিত পোদ্দার ঢাকা পোস্টকে বলেন, শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করেপোরেট করহারের ব্যবধান ন্যূনতম ১০ শতাংশ করা হলে ভালো হতো। যেটি বিএমবিএর পক্ষ থেকে বাজেট প্রস্তাবেও বলা হয়েছিল। ওই ট্যাক্স স্ল্যাবটা বাড়ানো হলে বাজারে অনেক ভালো কোম্পানি আসতে উৎসাহী হতো। তবে শুধু ট্যাক্স সুবিধা পেলেই যে বাজারে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়বে, বিষয়টা এমন নয়। এখানে আরও অনেক নীতিগত বিষয় রয়েছে। এছাড়া, ফেয়ার ভ্যালুয়েশন এবং লিস্টিং প্রক্রিয়া সহজ করার মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে ওইসব নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে একটি সুদূরপ্রসারী ভালো ফল আসতে পারে।

তিনি বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক ঋণের ওপর অতি-নির্ভরতা কমিয়ে শেয়ারবাজারের দিকে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এক্ষেত্রে কি পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হলে শেয়ারবাজার থেকে উত্তোলন করবে, আর কি পরিমাণ ব্যাংক থেকে নেওয়া যাবে এই বিষয়গুলো স্পষ্ট করা উচিত। এই ডেট-টু-ইক্যুইটি রেশিও ঠিক করার জন্যও সরকারের পলিসি সাপোর্ট প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের এই ইতিবাচক মনোভাব আমরা দেখতে পেয়েছি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তালিকাভুক্ত এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করহারের ব্যবধান ন্যূনতম ১০ শতাংশ করাসহ বেশ কিছু প্রস্তাব অংশীজনরা দিলেও বাজেটে তা প্রতিফলিত হয়নি। তা সত্ত্বেও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), ডিবিএ এবং বিএমবিএ-এর মতো প্রধান অংশীজনরা এই বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের যেসব প্রতিশ্রুতি এই বাজেটে রয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের শেয়ারবাজার একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অবস্থানে পৌঁছাবে।

ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারের লেনদেন নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া টি+টু থেকে একবারে টি+শূন্য না করে টি+ওয়ান করা যেতে পারে। সরাসরি টি+শূন্য করা হলে কিছু ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে করপোরেট করহারের ব্যবধান বাড়ানোর বিষয়টি চিন্তা করা উচিত। বাজেট প্রস্তাবনায় আইপিও প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী। এছাড়া, শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী টানতে পেনশন তহবিল, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং মিউচুয়াল ফান্ডের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও প্রশংসনীয়। সর্বোপরি বাজেটে করছাড় না থাকলেও অনেকগুলো ভালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে আগামী এক বছরে বাজারের দৈনিক লেনদেনের পরিমাণও ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকারের গৃহীত উদ্যোগ ও বিশেষ গুরুত্বারোপে ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। বাজেট প্রস্তাবনায় শেয়ারবাজারের টেকসই উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণে সময়োপযোগী দিকনির্দেশনার রয়েছে। রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ এবং শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদারে প্রস্তাবিত বাজেটে গৃহীত উদ্যোগ দেশের শেয়ারবাজারের আধুনিকায়নে একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। এ উদ্যোগের ফলে বাজার পরিচালনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়বে এবং একটি সমন্বিত, কার্যকর ও শক্তিশালী বাজার অবকাঠামো গড়ে উঠবে বলে আমরা বিশ্বাস করি, যা দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এমএমএইচ/বিআরইউ