প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জমি, ফ্ল্যাট ও ভবন কেনাবেচার ক্ষেত্রে বিনা প্রশ্নে স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। তবে, একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর ওপর কর বৃদ্ধি এবং জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর নতুন করে গেইন ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে সংগঠনটি।
রিহ্যাব বলছে, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে আবাসন খাত আরও স্থবির হয়ে পড়বে এবং ফ্ল্যাটের দাম বাড়ার চাপ শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের ওপরই পড়বে। তাই নতুন আরোপিত কর প্রত্যাহার করতে হবে।
সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল এ দাবি জানান।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জমি, ফ্ল্যাট ও বিল্ডিং ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিনা প্রশ্নে ‘স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও সাত দশমিক পাঁচ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আবাসন, নির্মাণ ও উৎপাদনমুখী খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অর্থনীতির বাইরে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসনসহ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পেলে তা মূলধারার অর্থনীতিতে ফিরে আসবে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং অর্থনীতিতে তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধি করবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে একটি সহজ, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যাতে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদান করে এবং অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির প্রবণতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়। তবে, আমরা সরকারের এই ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, রডসহ নির্মাণ সামগ্রীর ওপর আরোপিত অতিরিক্ত কর ও জমির মালিকের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের উপর নতুন গেইন ট্যাক্স আরোপের বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
ড. আলী আফজাল বলেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের প্রেক্ষাপটে পরিকল্পিত, আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। নব্বইয়ের দশক থেকে সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে রিহ্যাব এবং এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের আবাসন চাহিদা পূরণে ভূমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে প্রায় এক হাজার আটশ ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিত আবাসন ও নগর উন্নয়নে কাজ করছে। আবাসন শুধু একটি ভবন নয়, এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের ভিত্তি। পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও আধুনিক আবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিক জীবনের মানোন্নয়নে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট বলেন, আবাসন খাত দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও রাজস্ব সৃষ্টিকারী খাত। এ খাতের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, কাচ, বৈদ্যুতিক পণ্য, আসবাবপত্র, পরিবহন, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবাসহ প্রায় ২৬৯টি শিল্প খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। জিডিপিতে পুরো নির্মাণ খাতের অবদান প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা আবাসন খাতে বিনিয়োগ করেন, যা বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ, দেশীয় বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে। বর্তমানে এ খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে এবং আবাসিক, বাণিজ্যিক ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে করের চাপ বৃদ্ধি, নীতিগত সহায়তার ঘাটতি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাবে আবাসন খাত স্থবিরতার দিকে যাচ্ছে। সিঙ্গেল ডিজিট সুদে গৃহঋণের সীমিত সুযোগ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আবাসন ক্রয় কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ফ্ল্যাট বিক্রি না হওয়ায় ডেভেলপারদের মূলধন আটকে যাচ্ছে, ব্যাংকঋণের চাপ বাড়ছে এবং প্রকল্প হস্তান্তর ব্যাহত হচ্ছে। গত আড়াই বছরে তিনটি সরকার পরিবর্তনের কারণে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও নীতিনির্ধারণে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও অর্থপাচার-সংক্রান্ত চাপের প্রভাবেও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে আবাসন খাতে ক্রেতা সংকট দেখা দিয়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান লোকবল কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের এই নেতা বলেন, বাজেট প্রস্তাবের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, গৃহায়ন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা একাধিক বৈঠক করেছি। আমাদের দাবি ছিল সম্পত্তি নিবন্ধন ব্যয় কমানো এবং সহজ শর্তে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে গৃহঋণের ব্যবস্থা করা। বর্তমানে নিবন্ধন ব্যয় ১৩ শতাংশের বেশি হওয়ায় জমি ও ফ্ল্যাট কেনা-বেচা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রিহ্যাব নিবন্ধন ব্যয় সাত শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সম্পত্তি হস্তান্তরের ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রকৃত লেনদেন নিরুৎসাহিত হচ্ছে, দলিল মূল্য ও বাজারমূল্যের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে এবং সরকারের সম্ভাব্য রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দাবি ও প্রস্তাবের বেশিরভাগই প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি।
তিনি বলেন, রিহ্যাব নতুন করে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর গেইন ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছে। আমরা নানাভাবে সরকারকে ট্যাক্স দেই। আমাদের মনে হচ্ছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী আবাসন খাতকে রাজস্ব আদায়ের মেশিন বানাতে চাচ্ছে প্রশাসন। বর্তমানে জমির মালিককে দেওয়া সাইনিং মানির ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হয়। এর বাইরে ডেভেলপারের নির্মিত ফ্ল্যাটের ওপরও ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হলে তা আবাসন বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি করবে। ২৪টি ফ্ল্যাটের একটি প্রকল্পে জমির মালিক ১২টি ফ্ল্যাট পেলে এবং সেগুলোর মূল্য ১২ কোটি টাকা হলে, তাকে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা কর দিতে হবে। এতে জমির মালিকেরা অতিরিক্ত ব্যয় ডেভেলপারদের ওপর চাপিয়ে দেবেন এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব গিয়ে পড়বে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপর। ফলে ফ্ল্যাটের দাম আরও বেড়ে যাবে।
রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট বলেন, নির্মাণসামগ্রীর ওপর নতুন কর ও শুল্ক আরোপের ফলে নির্মাণ ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রডের ওপর কর বৃদ্ধি করার ফলে নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এমনিতেই বিদ্যুৎ এর মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রতি টন তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা দাম বৃদ্ধি পাবে। পিভিসি রেজিন ও পেট রেজিন এর কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। কোল্ড-রোল্ড কয়েলের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। কপার তার ও কপার টিউবের ওপর কর বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত কর বসেছে। আমরা মনে করি, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপর। বিদ্যুৎ-এর মূল্য বৃদ্ধির কারণে এমনিতেই অনেক নির্মাণ উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত দুই কোটি মানুষের আয়ের এ খাতটি যে অবস্থায় রয়েছে, সেখান থেকে আরও খারাপের দিকে যাবে।
দাবি জানিয়ে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট বলেন, জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ পাস করার আগে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) এর দাবি এবং প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনা করার জন্য আবারও প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ জাতীয় জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি। একই সঙ্গে নতুন আরোপিত কর প্রত্যাহার করার দাবি জানাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মো. হারুন অর রশিদ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট (চট্টগ্রাম রিজিয়ন) মোহাম্মদ মোরশেদুল হাসান।
এমএইচএন/জেআই/এসএম
