দেশের শেয়ারবাজার বর্তমানে এক বিশেষ সংকটকাল অতিক্রম করছে। এমন সময়ে নতুন করে বোনাস শেয়ার এবং পুঞ্জীভূত মুনাফার ওপর কর আরোপের সিদ্ধান্ত বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে বলে মনে করছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম।
তিনি বলেন, লভ্যাংশের ওপর দ্বৈত কর শেয়ারবাজারের কোম্পানিগুলো জন্য বোঝা। তার ওপর নতুন করে এই কর আরোপ করা হলে শেয়ারবাজারকে এটি আরও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।
বুধবার (১৭ জুন) বেলা ১১টায় রাজধানীর পল্টন টাওয়ারে অবস্থিত ইআরএফ অডিটোরিয়ামে ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (ওআইআরডি) কর্তৃক আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট : উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে আলোচক হিসেবে তিনি এমন বক্তব্য দেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ওআইআরডির চেয়ারম্যান এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব।
অধ্যাপক ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম বলেন, বর্তমান সরকারের ঘোষিত বিভিন্ন নীতিমালার কারণে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো এক ধরনের কর সংক্রান্ত উভয়সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে।
তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো যখন তাদের অর্জিত মুনাফা থেকে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়, তখন সেখানে দ্বৈত করের নীতি কার্যকর হয়। প্রথমত, কোম্পানি তার আয়ের ওপর একবার ট্যাক্স দেয়। দ্বিতীয়ত, সেই মুনাফার অংশ যখন নগদ লভ্যাংশ হিসেবে বিনিয়োগকারীর হাতে যায়, তখন তার ওপর পুনরায় কর দিতে হয়।
বিশেষ করে স্কয়ার ফার্মার মতো বড় কোম্পানিগুলোর পরিচালকদের হাতে থাকা কোটি কোটি শেয়ারের বিপরীতে প্রাপ্ত লভ্যাংশের ওপর বড় অংকের কর দিতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে নগদ লভ্যাংশ দিতে নিরুৎসাহিত করে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।
তিনি বলেন, বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি যেমন-গুগল, মেটা (ফেসবুক), ইন্টেল বা মাইক্রোসফট এই দ্বৈত কর এড়াতে সাধারণত নগদ লভ্যাংশ দিতে চায় না। বাংলাদেশেও বড় বিনিয়োগকারী বা প্রাতিষ্ঠানিক মালিকদের ওপর এই করের প্রভাব অত্যন্ত বেশি।
এই অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, শেয়ারবাজারের চলমান তারল্য সংকটের কারণে অনেক ভালো ব্যাংক ও কোম্পানি বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে চলে গেছে। এ পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলো নগদ অর্থের পরিবর্তে স্টক ডিভিডেন্ড বা বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে সেই বোনাস শেয়ারের ওপরও ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে।
তার মতে, বোনাস শেয়ারে কোনো নগদ অর্থের লেনদেন হয় না; এটি মূলত একটি ‘জার্নাল এন্ট্রি’ মাত্র। এতে কোম্পানির সম্পদ বা নগদ অর্থ বাড়ে না বা কমে না, বরং এটি একটি সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো। এর ওপর কর আরোপ করাকে ‘মোহাম্মদ বিন তুঘলকীয়’ সিদ্ধান্তের সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। পাশাপাশি এটি বাজারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এছাড়া এই বিশ্লেষক পুঞ্জীভূত মুনাফার ওপর কর আরোপের বিষয়ে সমালোচনা করে বলেন, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কোম্পানির পুঞ্জীভূত মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ কর বসানো হয়েছে, যা অতীতে একবার কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে তীব্র প্রতিবাদের মুখে প্রত্যাহার করা হয়। তার ধারণা, এবারও সরকার এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে। তা না হলে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তার মত।
তিনি মনে করেন, শেয়ারবাজারকে বাঁচাতে হলে এবং বড় বড় কোম্পানিগুলোকে বাজারে ধরে রাখতে হলে এই কর নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। শেয়ারবাজারের উন্নতির স্বার্থে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার এই ‘অযোগ্য ও অকার্যকর’ সিদ্ধান্তগুলো থেকে সরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই নীতিগুলো শেয়ারবাজারকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
অধ্যাপক ড. একেএস ওয়ারেসুল করিম বলেন, শেয়ারবাজারকে প্রকৃত অর্থে ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব করতে হলে লভ্যাংশের ওপর থেকে এই অতিরিক্ত করের বোঝা কমানো এবং বোনাস শেয়ার ও পুঞ্জীভূত মুনাফার ওপর কর প্রত্যাহারের কোনো বিকল্প নেই।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে উত্থাপিত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাজেট প্রস্তাবনায় বলা হয়, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি যদি নগদ লভ্যাংশের বদলে পুরোপুরি স্টক ডিভিডেন্ড বা বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে অথবা নগদ লভ্যাংশের তুলনায় স্টক ডিভিডেন্ডের পরিমাণ বেশি হয়, তবে ঘোষিত পুরো স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
এছাড়া পুঞ্জীভূত মুনাফায় (রিটেইন্ড আর্নিংস), অর্থাৎ কোম্পানির নিট মুনাফার ওপরও করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি (ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া) যদি তার কর-পরবর্তী নিট মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ হিসেবে না দেয়, তবে অর্জিত নিট মুনাফার বিপরীতে রাখা সংরক্ষিত আয়, তহবিল বা উদ্বৃত্তের ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কোম্পানি নিট মুনাফা হিসাব হয় সব ধরনের করারোপের পর। ফলে উভয় ক্ষেত্রে এ করারোপ হবে কর দেওয়া অর্থের ওপর ফের করারোপ।
এমএমএইচ/এসএম
