বিজ্ঞাপন

‘সর্বজন তুষ্টির আগামী বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থাকবে’

‘সর্বজন তুষ্টির আগামী বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থাকবে’

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ‘সর্বজন তুষ্টির বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এই বিশাল বাজেটের লক্ষ্য অর্জন এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন বা ইমপ্লিমেন্টেশন নিয়ে প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবে সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাজেট ঠিকই আছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকারের ম্যান্ডেট ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ এবং আন্তর্জাতিক মহল— সব পক্ষকে খুশি করার চেষ্টা করা হয়েছে এই বাজেটে। একটি রাজনৈতিক সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বাজেটের আকার বড় হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে মূল প্রশ্নটি হলো, এর বাস্তবায়ন কতটুকু বাস্তবসম্মত? আমি মনে করি, বর্তমান প্রেক্ষিতে এই বাজেটটি দরকার ছিল।

আজ (বৃহস্পতিবার)  ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাজেট টক ২০২৬-২৭’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।  

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বুয়েটের (অব.) অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. মো. ফেরদাউস আলম, আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের ট্রেজারার রেজা-উর-রহমান মাহমুদ এবং বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ ড. সামসুদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রাজস্ব বা ট্যাক্স সংগ্রহ বাড়ানো, ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করা, রপ্তানি খাতকে বহুমুখীকরণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। বাজেট শুধু কর আদায়ের মাধ্যম নয়, বরং এর প্রভাব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে পৌঁছানো জরুরি।

দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সরকার পরিচালিত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, জনতুষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের স্বার্থে এই সামাজিক সুরক্ষা খাতগুলো সরকার কোনোভাবেই বাদ দিতে পারবে না। তবে এই ক্ষেত্রে সব থেকে বড় সমস্যা হলো তথ্যের ‘ডুপ্লিকেশন’ বা একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা নেওয়া। এই বিষয়টিতে নজর রাখতে হবে।

বাজেটের অর্থের অপচয় রোধে একটি কম্প্রিহেনসিভ বা সমন্বিত তালিকা তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বর্তমানে ভিজিএফ কার্ড এবং টিসিবি কার্ডের তালিকায় অনেক ক্ষেত্রে ডুপ্লিকেশন লক্ষ্য করা যায়। যদি একটি স্বচ্ছ তালিকার মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়— যেমন এক কোটি কার্ডধারীর মধ্যে যদি ৮০ লক্ষ প্রকৃত দরিদ্র মানুষকে শনাক্ত করা যায়, তবে অর্থের বড় ধরনের অপচয় রোধ হবে। এই সাশ্রয়কৃত অর্থ পরবর্তী সময়ে অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা সম্ভব হবে।

তিনি মনে করেন, বর্তমান সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্জিত সাফল্যকে সংহত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেটের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। যথাযথ তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে সর্বজন তুষ্টির এই বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো কঠিন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর বলেন, অনেক প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেগুলোর আসলে প্রয়োজন নেই। আমাদের সময়েও এমন অনেক প্রকল্পের প্রস্তাব এসেছে, যেগুলোর যথার্থতা বিশ্লেষণ করে আমরা বাতিল করেছি। আমার এলাকায় অনেক বদনাম আছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারে সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকেও আমার এলাকার জন্য কিছুই করিনি। অনেকেই রাজনৈতিক স্বার্থে নিজের বাড়ির রাস্তাটি করিয়ে নিতে চায়। বস্তুতপক্ষে, সেখানে জনগণের যতটা না উপকার হয়, তার চেয়ে ওই রাজনৈতিক ব্যক্তির বেশি উপকার হয়। এই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে প্রকল্প অনুমোদন করা উচিত।

তার মতে, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পলিসি ভিন্ন হতে হবে। রাজনৈতিক স্বার্থে অর্থ বরাদ্দ হতে পারবে না। তাহলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পলিসি হতে হবে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যেই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানিয়েছেন সাবেক এই অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আগামী বাজেটে সরকার মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে রাখার টার্গেট নিয়েছে। ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই সাইড পূরণ না হলে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। বাজার মনিটরিং করা যায়; কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এক্ষেত্রে সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ড ফুলফিল করেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে ‘রিফর্ম’ দরকার বলে মনে করেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তার মতে, প্রথম বছরেই সব করে ফেলা যাবে না। যদি রিফর্ম হয়, তাহলে ৩ থেকে ৪ বছর পর ভালো ফল আসবে। রাজনৈতিক সরকারের কাছে এই সময়টা আছে। তাই রিফর্মের দিকে নজর দেওয়া দরকার। না হলে গতানুগতিক বাজেটের ধারা থেকে বের হওয়া যাবে না।

এমএমএইচ/এসএএস/এনএফ