যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি লুটতরাজ-ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে না, তত তিন পর্যন্ত যত সুন্দর বাজেট ও পলিসি গ্রহণ করি না কেন, খুব সফল হওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ।
আজ (বৃহস্পতিবার) রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, শুধু বাজেটের আকার বড় করলেই বা নতুন নীতি গ্রহণ করলেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জিত হবে না; অর্থনীতির ভিত্তিগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে লুটপাট, দুর্নীতি ও রেন্ট-সিকিং নির্ভর অর্থনীতি। এ ধরনের অর্থনীতিতে নতুন সম্পদ সৃষ্টি হয় না, বরং সম্পদ অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং বৈষম্য বাড়ে। বিপরীতে উৎপাদনশীল অর্থনীতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ বাড়ায় এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব না দিলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার’ বাস্তবায়নে কাজ করছে। পাশাপাশি কুমার, তাঁতি, কারুশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কর্মসূচির আওতায় দক্ষতা উন্নয়ন, ঋণ, ব্র্যান্ডিং ও বাজার সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় র্যাপিডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার পুনরুদ্ধার জরুরি। তবে এক বছরে ৪৭ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বর্তমানে রাজস্ব আহরণই সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল ভিত্তি। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সুদ পরিশোধের চাপ নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ সংকুচিত করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু কর ছাড় বা ভর্তুকি যথেষ্ট নয়। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এবং পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে না আনলে বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়বে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি কৃষি আধুনিকায়ন ও কৃষিভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ টি এম নূরুল আমিন এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
প্যানেল আলোচনায় তারা বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও পুঁজিবাজারে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে ডিজিটাল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসেস এবং কৃষক কার্ডের সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন জরুরি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী নির্বাচনে প্রক্সি মিনস টেস্ট এবং ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনতে হবে, যাতে তৃণমূল পর্যন্ত সঠিক ব্যক্তির কাছে সহায়তা পৌঁছায়। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
আরএম/এসএএস/এনএফ
