অবশেষে কালোটাকা বৈধ করার প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে সরকার। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বাড়তি সুবিধাসহ অর্থবিলে ৬৪ সংশোধনীসহ সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের অর্থবিল পাস হয়।
বাজেট আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থবিলে সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপন করেন এবং পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।
সংশোধনীর মধ্যে আরও রয়েছে– ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা, দলিল নিবন্ধন ও নামজারির ক্ষেত্রে ই–টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তও প্রত্যাহার, চিংড়ি খাতের রপ্তানি বাড়াতে ভ্যাট ও শুল্ক ছাড়, প্লাস্টিক ও বেভারেজ শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক বাড়ানো থেকে সরে আসা, এলইডি ল্যাম্প ও প্রি–ফেব্রিকেটেড ভবন নির্মাণ শিল্পে রেয়াতি সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে একাধিক কর–সুবিধার ঘোষণা দেওয়া ইত্যাদি।
কালোটাকা সাদা করার প্রস্তাব বাতিল
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনের নামে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমির প্রকৃত মূল্য নিবন্ধন না হওয়ায় করদাতাদের হয়রানি কমানোর উদ্দেশ্যে বিধানটি আনা হয়েছিল। কিন্তু জনমনে একে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাই তিনি অর্থমন্ত্রীকে ওই বিধান প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন।
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি
প্রধানমন্ত্রী করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিগত আয়কর অব্যাহতির সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬–২৭ ও ২০২৭–২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার, ২০২৮–২৯ ও ২০২৯–৩০ করবর্ষে ৪ লাখ এবং ২০৩০–৩১ করবর্ষে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সীমা যথাক্রমে ৪ লাখ, সাড়ে ৪ লাখ এবং ৫ লাখ টাকা করের প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা তাদের আয়ের ওপর আগামী অর্থবছরে সাড়ে তিন লাখ টাকার পরিবর্তে চার লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা পাবেন।
ই–টিআইএন বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার
ব্যাংক হিসাব খোলা এবং সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় জমি বা ফ্ল্যাটের বণ্টননামা, দলিল নিবন্ধন ও নামজারির ক্ষেত্রে ই-টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব থেকে সরকার সরে এসেছে। এ বিষয়ে জনমনে বিভ্রান্তি এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী এ সিদ্ধান্ত নেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর কমছে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ আয়কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। তবে গবেষণায় বিনিয়োগ, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপন এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ বাড়ানোর শর্ত দেওয়া হয়েছে।
ভ্যাট ও শুল্কে বড় পরিবর্তন
চিংড়ি শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় ফিড অ্যাডিটিভ, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন, মিনারেলস ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক-ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্লাস্টিক ও বেভারেজ শিল্পের কাঁচামাল পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশে বাড়ানোর প্রস্তাব বাতিল করে আবার ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। এছাড়া বৈদ্যুতিক তার তৈরির কপার আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার, অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনে ভ্যাট কমে ৫%
ফেসবুক, ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন ও অন্যান্য অনলাইন মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে নতুন প্রণোদনা
পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। আইপিও, ডাইরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যু বা রিপিট পাবলিক অফারের মাধ্যমে অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়লে অতিরিক্ত কর রেয়াত মিলবে। পাশাপাশি সব ধরনের লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে সম্পন্ন করলে আরও কর ছাড়ের সুযোগ থাকবে। এছাড়া জিরো কুপন বন্ডের আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত করা হয়েছে এবং মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কর রেয়াতের সর্বোচ্চ সীমাও তুলে দেওয়া হয়েছে।
স্বর্ণ ও অলংকারে কর পুনর্নির্ধারণ
স্বর্ণ, প্লাটিনাম, হীরা ও রূপার অলংকারের ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট ও করের হার পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। সংশোধিত অর্থবিলে প্রতি ভরি স্বর্ণ বা স্বর্ণালঙ্কার এবং প্লাটিনামের ক্ষেত্রে আড়াই হাজার টাকা, প্রতি গ্রাম হীরার ক্ষেত্রে আড়াই হাজার টাকা এবং প্রতি ভরি রূপার অলংকারের ক্ষেত্রে ১০০ টাকা কর নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের মতে, এই খাতে কর কাঠামোকে আরও বাস্তবসম্মত ও সুশৃঙ্খল করতে এ পরিবর্তন আনা হয়েছে
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিআইএন বাধ্যতামূলক
ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের ক্ষেত্রে ই-টিআইএন বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে, তবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাব, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিআইএন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) বা তালিকাভুক্তির প্রমাণক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য কর-সুবিধা আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনুরোধ রাখতে চাই যে পার্বত্য জেলার যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আছে, তাদের করমুক্ত আয়ের এই সুবিধাটা আরেকটু বাড়িয়ে তাদের ব্যবসা কৃষি খাতসহ অন্যান্য আয়ের পাশাপাশি বেতনের আয়কেও করমুক্ত করা। এটা পাহাড়ি এবং সমতল উভয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর যারা আছেন, উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
এছাড়া স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেন। এছাড়া তিনি স্থানীয়ভাবে এলইডি ল্যাম্প উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রি-ফেব্রিকেটের বিল্ডিং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ী বর্তমানে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, ওটিটি প্লাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং অন্যান্য অনলাইন মিডিয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট থাকায় অনেক সময় ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের অর্থ পরিশোধ না করে অন্যভাবে অনানুষ্ঠানিক উপায়ে অর্থ পরিশোধ করেন। সেজন্য ওই ব্যক্তির যেমন লাভ হচ্ছে না। একই দিকে সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। এ খাতে ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন। এছাড়া বিটিআরসির সঙ্গে টেলিকম কোম্পানিগুলোর রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার, সব ধরনের মাঠ সরবরাহের ক্ষেত্রে জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি। স্থানীয়ভাবে ডাবল কেবিন পিকআপ এবং মাইক্রোবাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ যে ভ্যাট আছে, তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১১ জুন প্রথমবারের মতো অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। বাজেট আলোচনার সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর–ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও করদাতাবান্ধব করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিষয়ে কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব আনতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন।
অর্থমন্ত্রী বিলটি পাসের প্রস্তাব করেন, যা ১১ জুন বাজেট অধিবেশনে উত্থাপন করেছিলেন তিনি। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতারা। সংশোধনী প্রস্তাব ও আলোচনা শেষে অর্থবিল পাস হয়।
আরএম/বিআরইউ
