বিজ্ঞাপন

ইরান যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় মন্দার আশঙ্কা

ইরান যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় মন্দার আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার জের ধরে জ্বালানি সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ায় এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এই সতর্কবার্তা দিয়েছে।

আইএমএফের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বছরে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই হামলার জবাবে ইরান ওই অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে পাল্টা আঘাত হানে। ফলে করোনা মহামারি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন করে অস্থিতিশীলতার মুখে পড়েছে।

আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াতে পারে মাত্র ৩ শতাংশে, যা গত বছরও ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে গত এপ্রিলে সংস্থাটি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আরও কিছুটা কমাল। এর মাধ্যমে এই সংঘাত যে দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিচ্ছে, সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে।

তবে এই পূর্বাভাসগুলো এখনও অনেক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতে নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি কতদিন টিকবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে ইরানের তেল বিক্রির ক্ষেত্রে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত বুধবার তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো জোটের এক বৈঠকে এই যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় এটি (যুদ্ধবিরতি) শেষ হয়ে গেছে।”

এদিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে কয়েকমাস ধরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে হু হু করে বেড়েছে জ্বালানির দাম, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ে। আইএমএফের আশঙ্কা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চড়া দামের কারণে ২০২৫ সালের ৪ দশমিক ১ শতাংশের তুলনায় ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।

২০২৬ সালের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস কিছুটা নেতিবাচক হলেও, বৈশ্বিক অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা দেখাতে পারছে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসের চেয়ে শক্তিশালী ছিল। কারণ, একদিকে তেলের চড়া দামের প্রভাব কমাতে সাহায্য করেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বড় বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

আইএমএফের অর্থনীতিবিদেরা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, “যুদ্ধের যে ধাক্কা, তা বৈশ্বিক অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে আশঙ্কার চেয়ে বেশ ভালোভাবেই মোকাবিলা করতে পেরেছে।”

এই যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং চলতি বছরে এই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতি বড় ধরনের সংকোচনের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার পর, গত এপ্রিল মাসের তুলনায় দেশটির অর্থনৈতিক পূর্বাভাস কিছুটা ইতিবাচক মোড় নিয়েছে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনার পর, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের জ্বালানি পণ্য বিক্রির জন্য দেওয়া ৬০ দিনের বিশেষ লাইসেন্স বাতিল করেছে।

অন্যদিকে চড়া জ্বালানি তেলের কারণে বিশ্বের প্রধান প্রধান জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশগুলোও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়েছে। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে চলতি বছরে ৬ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চীনের প্রবৃদ্ধিও গত বছরের ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

তবে জ্বালানি তেল রপ্তানি এবং প্রযুক্তি খাতে বড় বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে চাঙ্গা রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের কোনো পরিবর্তন হয়নি। দেশটির প্রবৃদ্ধি গত এপ্রিলের পূর্বাভাসের মতোই ২ দশমিক ৩ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের চড়া দাম রাজনৈতিকভাবে বেশ বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন এম ওয়ারশ গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত কয়েক সপ্তাহে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কিছুটা কমে এসেছে। গত সপ্তাহে ইউরোপে এক সভায় অংশ নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষ্যমাত্রা (২ শতাংশ) অর্জনে ব্যর্থ হওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

এদিকে আইএমএফ নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন বাজারে পণ্যের অস্থিতিশীল দাম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিষয়টি মূল্যায়ন করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দেন।

সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।  

এনএফ