বিজ্ঞাপন

শেয়ারবাজারে এক দশকে বিও হিসাব কমেছে ১৫ লাখ

শেয়ারবাজারে এক দশকে বিও হিসাব কমেছে ১৫ লাখ

দীর্ঘ সময় ধরে আস্থাহীনতায় ভুগছে দেশের শেয়ারবাজার। বিনিয়োগের জন্য নেই ভালো পণ্য। বন্ধ রয়েছে নতুন পণ্যের জোগান প্রক্রিয়া- প্রাথমিক গণপ্রস্তাবও (আইপিও)। বিগত এক দশকে যেসব আইপিও এসেছে, তার মধ্যে হাতে গোনা দুই-একটি বাদে অন্যগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। বর্তমানে শেয়ারবাজারে যে কোম্পানিগুলো রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ভালোর চেয়ে মাঝারি মানের ও দুর্বল শেয়ারের সংখ্যাই বেশি। ফলে বিনিয়োগের জন্য মানসম্পন্ন পণ্যের বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ বছর ধরেই বাজার ছাড়ছেন বিনিয়োগকারী।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত এক দশকে বেনিফিশারি ওনার্স (বিও) হিসাব বিবেচনায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। বিনিয়োগকারী কমার কয়েকটি বড় কারণের মধ্যে আইপিও না আসা, ভালোমানের বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের অনুপস্থিতি, দুর্বল কোম্পানিতে বিনিয়োগে ধারাবাহিক লোকসান এবং করপোরেট সুশাসনের অবনতিকে দায়ী করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তবে বিনিয়োগকারীদের বাজারমুখী করতে দ্রুত ভালোমানের আইপিও আনতে পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। অন্যথায় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা আরো কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিও হিসাবের সংরক্ষণাগার সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১ জুলাই শেয়ারবাজারে বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ৫৩ হাজার। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে এই সংখ্যা কমে ১৬ লাখ ৭৫ হাজারে নেমেছে। অর্থাৎ গত দশ বছরে বিও হিসাবের সংখ্যা কমেছে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার বা প্রায় ৪৭ শতাংশ। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় ১ শতাংশেরও কম মানুষের বিও হিসাব রয়েছে। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে মোট জনসংখ্যার ৯ শতাংশেরও বেশি মানুষ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা তখনই বাজারে থাকবেন, যখন তারা যৌক্তিক মুনাফার নিশ্চয়তা পাবেন। দীর্ঘ বছরেও এই বাজারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া, দীর্ঘ বছর ধরে চেষ্টা করেও ভালো আইপিও আনা সম্ভব হয়নি। যে আইপিওগুলো এসেছে সেগুলোও মুখ থুবড়ে পড়েছে। আবার অনেক বিনিয়োগকারী ব্রোকারেজ হাউস ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারণে ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন।

dhakapost

এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত ১০ বছরে বাজারে আসা অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ কিংবা তার বেশি লোকসানের মুখে পড়েছেন। এ সময়ে অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম অর্ধেকেরও বেশি কমেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত লভ্যাংশও দেয়নি। বিনিয়োগকারীর সুরক্ষার ঘাটতি এবং করপোরেট সুশাসনের অবনতির কারণে অনেক বিনিয়োগকারী ব্রোকারেজ হাউস ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব কারণে নতুন বিনিয়োগকারীরা বাজারে আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, আর পুরোনো অনেক বিনিয়োগকারী ধীরে ধীরে বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, অনেকেই শুধু আইপিওতে আবেদন করার জন্য বিও হিসাব চালু রাখেন। কিন্তু গত দুই বছরে কোনো কোম্পানিই আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেনি। এর আগে বাজারে আসা আইপিওগুলোর মধ্যে অনেকগুলো মানসম্মত ছিল না। যদিও বিও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি কমানোর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবুও শক্তিশালী মৌলভিত্তির নতুন কোম্পানির আইপিওতে না আসায় অনেকেই বিও হিসাব বন্ধ করেছেন। এ পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের মেয়াদে আমরা শেয়ারবাজারে ৫০ লাখ বিনিয়োগকারী যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছি। এই লক্ষ্য অর্জনে শেয়ারবাজারে যেই সাপোর্টের প্রয়োজন, সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমার কমিশনের সঙ্গে আলোচনাও করেছি।  

অভিজ্ঞ এই বাজার অংশীজন আরো বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে বাজারে ভালোমানের আইপিও আনা, বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় মুনাফার পরিবেশ তৈরি, করপোরেট সুশাসন জোরদার এবং একটি কার্যকর ও সুস্থ পুঁজিবাজার গড়ে তোলা জরুরি। কমিশন সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে। তাই আমরা আশাবাদী, ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

নারী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর বিও বন্ধের হার বেশি

মোটাদাগে দিনের মোট হিসাবের ভিত্তিতে তিন শ্রেণির বিও হিসাবধারীর সংখ্যা পৃথকভাবে হালনাগাদ করে সিডিবিএল। এর মধ্যে ‘পুরুষ ও নারী’, ‘দেশি ও বিদেশি’ এবং ‘একক ও যৌথ’। তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বিও হিসাব বন্ধ হওয়া বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীদের হার বেশি দেখা গেছে। একইভাবে দেশি বিনিয়োগকারীর তুলনায় বিদেশি/প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা বেশি হারে বাজার ছেড়েছেন। আর একক বিও হিসাবের তুলনায় যৌথ হিসাব বেশি বন্ধ হয়েছে।

dhakapost

২০১৬ সালের ১ জুলাই দেশের শেয়ারবাজারে পুরুষ বিও হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ২২ লাখ ৯০ হাজার। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৬৩ হাজারের ঘরে। অর্থাৎ এক দশকে পুরুষ বিনিয়োগকারীর বাজার ত্যাগ করার হার অর্ধেকের চেয়ে কম। অথচ গত ১০ বছরে নারী বিও হিসাবধারীর সংখ্যা ৮ লাখ ৫২ হাজার থেকে কমে ৩ লাখ ৯৪ হাজারে নেমেছে। অর্থাৎ আলোচিত সময়ে নারী বিনিয়োগকারী কমেছে অর্ধেকের বেশি। আর আলোচিত সময়ের ব্যবধানে বিদেশি বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ১ লাখ ৫৭ হাজার থেকে গত অর্থবছর শেষে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩ হাজারে।  

এছাড়া একক বিও হিসাবধারীর সংখ্যা গত দশ বছরে ১৯ লাখ ৫৩ হাজার থেকে কমে ১২ লাখ ১৫ হাজারে নেমেছে। এই হিসেবে আলোচিত সময়ে একক বিও হিসাব বন্ধের হার অর্ধেকের অনেক কম। আর যৌথ বিও হিসাবধারীর সংখ্যা গত দশ বছরে ১১ লাখ ৯০ হাজার থেকে কমে ৪ লাখ ৪২ হাজারে নেমেছে। অর্থাৎ যৌথ বিও হিসাবধারী কমার হার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

বাড়ছে শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যা

সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিও হিসাবের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি শেয়ারবাজারে মোট বিও হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৪১ হাজার। গত ৩০ জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৭৫ হাজার। অর্থাৎ ছয় মাসে বিও হিসাবধারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৪ হাজার। সংখ্যা বিবেচনায় বর্তমানে মোট বিও হিসাবের ২ শতাংশের বেশি যুক্ত হয়েছে গত ছয় মাসে।

চলতি বছরে বিও হিসাবের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যাও প্রায় সমানতালে বাড়ছে। এর অর্থ হলো বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়লেও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন বড় একটি অংশ। চলতি বছরের শুরুতে শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার, যা গত জুন শেষে বেড়ে ৩ লাখ ৯৫ হাজার হয়েছে। অর্থাৎ গত ছয় মাসে শেয়ারশূন্য বিও হিসাব বেড়েছে ২৭ হাজার।

এ বিষয়ে সিডিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব বলেন, বছরের প্রথমার্ধে বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থাকায় অনেকে মুনাফা তুলে বাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। একই সময়ে ডিফল্টার ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কিছু বিও হিসাব থেকে শেয়ার স্থানান্তর এবং বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ফি এড়াতে নিষ্ক্রিয় হিসাব বন্ধ করাও এ প্রবণতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নতুন আইপিও এলে এবং বাজার ইতিবাচক থাকলে আবার নতুন বিও হিসাব খোলার প্রবণতা বাড়বে।

তবে শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যা বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন। তিনি বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী একটি ব্রোকারেজ হাউস থেকে অন্য হাউসে লিংক অ্যাকাউন্ট স্থানান্তর করলে আগের বিও হিসাব শেয়ারশূন্য হয়ে যায়। আবার কোনো ব্রোকারেজ হাউস নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও নিরাপত্তার স্বার্থে অনেকে হিসাব অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করেন। কেউ শেয়ার বিক্রি করে সাময়িকভাবে বাজারের বাইরে চলে যান, আবার কেউ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নতুন বিও হিসাব খুলে রাখেন। তাই নতুন বিও হিসাবে সংখ্যা বাড়া এবং শেয়ারশূন্য হিসাব বৃদ্ধিকে সব সময় একই প্রবণতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগকারীর ভিন্ন ভিন্ন আচরণের ফলও হতে পারে।

এমএমএইচ/জেডএস