বিজ্ঞাপন

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জাপানের পাইকারি মূল্যস্ফীতি ৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জাপানের পাইকারি মূল্যস্ফীতি ৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় জুনে জাপানে পাইকারি মূল্যস্ফীতির গতি ব্যাপক বেড়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। উৎপাদকেরা এই বাড়তি খরচের বড় অংশ সরাসরি খুচরা পর্যায়ে বা ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। শুক্রবার প্রকাশিত সরকারি তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার আরও বাড়ানোর দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এর ঠিক এক দিন আগে, বৃহস্পতিবার ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) এক প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা দেয়। সেখানে বলা হয়, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব অতীতের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে বাজারে ছড়াচ্ছে। এর ফলে চলতি বছরের শেষের দিকে দেশটিতে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

ব্যাংক অব জাপানের (বিওজে) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুনের তুলনায় এ বছরের জুনে উৎপাদক মূল্যসূচক (পিপিআই) বেড়েছে ৭ দশমিক ১ শতাংশ। এই বৃদ্ধির হার বাজার বিশ্লেষকদের অনুমিত গড় পূর্বাভাস (৬ দশমিক ৮ শতাংশ) ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০২৩ সালের মার্চের পর সর্বোচ্চ বার্ষিক বৃদ্ধি। এর আগে মে মাসে এই সূচক সংশোধিত হিসাবে বেড়েছিল ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।

সোম্পো ইনস্টিটিউট প্লাসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মাসাতো কোইকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা থমকে যাওয়ায় পাইকারি মূল্যস্ফীতি চড়া থাকবে। এ ছাড়া সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট এবং অতীতে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাবও বিভিন্ন পণ্যের মূল্যে ছড়িয়ে পড়বে। 

তিনি আরও বলেন, যদি বিভিন্ন পণ্যের দাম এভাবে তীব্র গতিতে বাড়তে থাকে, তবে ব্যাংক অব জাপান আগামী অক্টোবরের মধ্যেই সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। 

সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, উৎপাদক মূল্যসূচকের এই উল্লম্ফনের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে জ্বালানি তেলের দাম ২২ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি এবং অলৌহঘটিত ধাতুর (নন-ফেরাস মেটাল) দাম ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যাওয়া। এর মাধ্যমে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকটের প্রভাব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট কাঁচামালের শক্তিশালী চাহিদার বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পাশাপাশি, জাপানি মুদ্রা ইয়েনের টানা দরপতনও কাঁচামাল আমদানির খরচ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

গত জুনে ইয়েন-ভিত্তিক আমদানি মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২২ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ গতি। এর আগে মে মাসে এই সূচক সংশোধিত হিসাবে বেড়েছিল ২৬ দশমিক ১ শতাংশ। 

চলতি মাসের নীতি নির্ধারণী বৈঠকে ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) যে বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করবে, এই তথ্যগুলো সেখানে গুরুত্ব পাবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড সুদের হার অপরিবর্তিত রাখবে। তবে তারা নতুন ত্রৈমাসিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস প্রকাশ করতে পারে, যা থেকে পরবর্তী সুদের হার বৃদ্ধির সময়সূচি সম্পর্কে স্পষ্ট আভাস মিলবে।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট বিওজের নীতি নির্ধারণের পথকে বেশ জটিল করে তুলেছে। একদিকে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে, অন্যদিকে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপে পড়েছে।

তবে সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে জাপানের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বিওজের ত্রৈমাসিক ব্যবসায়িক জরিপ ‘টানকান’-এ উঠে এসেছে, দেশটির ব্যবসায়িক মনোভাব গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাও রেকর্ড ছুঁয়েছে। সার্বিক এই পরিস্থিতি সুদের হার আরও বাড়ানোর পক্ষে জোরালো যুক্তি তৈরি করছে।

গত মাসে নীতি নির্ধারণী সুদের হার ১ শতাংশে উন্নীত করে ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায় ব্যাংক অব জাপান (বিওজে)। সে সময় পাইকারি মূল্যস্ফীতির টানা ঊর্ধ্বগতির কথা উল্লেখ করে ইরান যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রয়টার্সের এক জরিপে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ বিশ্লেষকই মনে করছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিওজে সুদের হার আরও বাড়িয়ে ১ দশমিক ২৫ শতাংশে নিয়ে যেতে পারে।

তবে ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক কম থাকায় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছুটা জটিলতায় পড়তে পারে বিওজে। মে মাসে টানা চতুর্থ মাসের মতো মূল ভোক্তা মূল্যস্ফীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ লক্ষ্যের নিচেই ছিল। এর পেছনে মূল কারণ ছিল জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির ধাক্কা থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে সরকারি ভর্তুকির ধারাবাহিকতা, যা বাজার মূল্যের ওপর বাড়তি চাপের লাগাম টেনে ধরেছে।

ঢিলেঢালা মুদ্রানীতির সমর্থক হিসেবে পরিচিত জাপানের অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী মিনোরু কিউচি শুক্রবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, অতীতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও, সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের ফলে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি এখনও বেশ সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দরপতনের কারণে মূল্যস্ফীতিতে যে গতি এসেছে, তার প্রভাব বাজারে পড়তে কিছুটা সময় লাগবে এবং এই প্রভাব খুব একটা বড় নাও হতে পারে। 

সূত্র : রয়টার্স। 

এনএফ