জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ এবং ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে’ বিভক্ত করার প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দল। একই সঙ্গে দেশের তলানিতে থাকা কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সরকারের পরিকল্পনা ও কৌশল সম্পর্কেও সংস্থাটি বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর কার্যালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এনবিআর থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের নেতৃত্বে সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি বৈঠকে অংশ নেয়। আলোচনায় নতুন বাজেট, রাজস্ব ঘাটতি, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।
বৈঠকে এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে 'রাজস্ব নীতি বিভাগ' এবং 'রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ' বিভক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে সরকার। শিগগিরই এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে বলে বৈঠকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এনবিআরের নতুন কাঠামো অনুযায়ী, নীতি বিভাগ কর আইন প্রণয়ন, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় করবে, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা বিভাগ কর আদায়, নিরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। যদিও এনবিআরের একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরোধিতার মুখে সরকার অধ্যাদেশটি পুরোপুরি বাতিলের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বৈঠকে এনবিআর আইএমএফ প্রতিনিধিদের জানায়, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং বকেয়া রাজস্ব আদায় জোরদারের মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। করহার না বাড়িয়ে করজালকে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র ছাড়া নতুন কোনো কর অব্যাহতি দেওয়া হয়নি।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, যা ইয়েমেন ও সুদানের সামান্য উপরে।
গত জুনে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বর্তমানে এই হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি ২০২৬-২৯’ অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে এটি ১০ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
গত কয়েক বছরে আইএমএফের শর্তানুযায়ী কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এনবিআর। বিশেষ করে গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কৌশল সম্পর্কে আইএমএফ বিস্তারিত জানতে চেয়েছে।
নতুন ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাঁচ দিনের সফরে ঢাকায় এসেছে আইএমএফের এই প্রতিনিধি দল। বৈঠকে এনবিআরের উপস্থাপিত পরিকল্পনাগুলো নোট করে নিয়েছেন তারা। পরবর্তী বৈঠকে তারা তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৪৪টি সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাজার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছে সরকার।
পরবর্তী ধাপের আলোচনায় নতুন ঋণচুক্তির অগ্রগতি, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের অর্থায়নের মতো বিষয়গুলো উঠে আসতে পারে বলে এনবিআর সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আরএম/ডিএ
