বিজ্ঞাপন

মার্জিন ঋণের নতুন প্রস্তাবে ‘পিবি রেশিও’ আতঙ্ক

মার্জিন ঋণের নতুন প্রস্তাবে ‘পিবি রেশিও’ আতঙ্ক

পুঁজিবাজারে তারল্য ও লেনদেন বাড়াতে মার্জিন ঋণের বিধিমালা শিথিলের উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। তবে নতুন খসড়া প্রস্তাবনায় যুক্ত হওয়া ‘পিবি রেশিও’ (প্রাইস টু বুক ভ্যালু) শর্তের কারণে বিমা খাতের অধিকাংশ কোম্পানিই মার্জিন ঋণ সুবিধা হারানোর শঙ্কায় পড়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়ে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরে বিতর্কের মুখে এই বিধানটি পর্যালোচনার (রিভিউ) আশ্বাস দিয়েছে বিএসইসি। 

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়াতে ‘বিএসইসি (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’ পুনরায় সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের মেয়াদে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বিধিমালাটি প্রথম গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমান কমিশন বাজার অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এর একটি সংশোধনী খসড়া তৈরি করে জনমত আহ্বান করেছে। 

প্রস্তাবিত এই খসড়ায় বিনিয়োগকারী ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একাধিক ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে মার্জিন ঋণ পাওয়ার জন্য বিও অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম সিকিউরিটিজের পরিমাণ ৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি কম লভ্যাংশ দেওয়া ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রেও ঋণ সুবিধা যুক্ত রাখা হয়েছে।

এছাড়া ব্রোকারেজ হাউজসহ অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্জিন ঋণ বিতরণের সীমা বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে গ্রাহকের ইকুইটির বিপরীতে মার্জিন অর্থায়নের সর্বোচ্চ অনুপাত ক্ষেত্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন না রেখে সব ক্ষেত্রে ১:১ (এক অনুপাত এক) নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে, যদিও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব নীতি অনুযায়ী এর চেয়ে কম ঋণ দিতে পারবে। আগে পরিস্থিতিভেদে এটি এক অনুপাত এক, এক অনুপাত শূন্য দশমিক পাঁচ ও এক অনুপাত শূন্য দশমিক ২৫ ছিল। 

দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৮টি বিমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেবল ৭-৮টি প্রতিষ্ঠান মার্জিন ঋণের সুবিধা পাওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হতে পারে

নতুন খসড়া প্রস্তাবনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়াতে নিট সম্পদের বিপরীতে অর্থায়নের সীমা তিন গুণ থেকে বাড়িয়ে পাঁচ গুণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের মূলধন ১০০ টাকা হলে বর্তমানে তারা সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে; নতুন নিয়মে তা বেড়ে ৫০০ টাকা হতে পারে। আর একক কোনো কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণের এক্সপোজার সীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। গ্রাহকের ইকুইটি ৭৫ শতাংশের নিচে নামলে আগে মার্জিন কল দেওয়া হলেও এখন তা ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নামলে ফোর্সড সেলের (নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রি) বিধানটি আগের মতোই অপরিবর্তিত থাকছে। তাছাড়া, সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে মূল্য-আয় অনুপাত বা ‘পিই রেশিও’ ৩০-এর ওপরে উঠলে সেটি মার্জিন ঋণ দেওয়ার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবে।

এতসব স্বস্তির মধ্যে ‘পিবি রেশিও’ ঠিক বিপরীতমুখী অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিমা খাতের জন্য প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এই খাতের কোম্পানিগুলোর ‘পিবি রেশিও’ যদি ১ (এক)-এর অধিক হয়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। অর্থাৎ নির্ধারিত দিনে কোনো বিমা কোম্পানির শেয়ারমূল্য যদি সর্বশেষ শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের (এনএভিপিএস) তুলনায় বেশি হয়, তাহলে ওই শেয়ারে মার্জিন সুবিধা পাওয়া যাবে না। এই হিসাবে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৮টি বিমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেবল ৭-৮টি প্রতিষ্ঠান মার্জিন ঋণের সুবিধা পাওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হতে পারে।

অন্যদিকে, প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ‘পিবি রেশিও’ ৩ (তিন)-এর অধিক হলে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। এক্ষেত্রে অবশ্য তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। কারণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের বাজারমূল্য শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের কাছাকাছি রয়েছে। ফলে অন্যান্য শর্তে না আটকালে ‘পিবি রেশিও’-এর কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্জিন ঋণ পেতে কোনো ধরনের বাধা থাকবে না।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর আকার তুলনামূলক ছোট এবং বেশিরভাগ কোম্পানি নিয়মিত ভালো পরিমাণ লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকায় এই খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের বাজারদর শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের (এনএভিপিএস) তুলনায় বেশি রয়েছে। বিপরীতে খেলাপি ঋণ ও ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের বাজারদর শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত বিধিমালা থেকে বিমা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘পিবি রেশিও’ সীমা বাড়ানো অথবা প্রস্তাবটি বাতিল করা সমীচীন হবে।

শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিএসইসি যেহেতু এখনো মার্জিন বিধিমালাটি চূড়ান্ত করেনি এবং মতামত আহ্বান করেছে, সেহেতু বিভিন্ন মতের আলোকে যৌক্তিক সমাধানও আসতে পারে। আমি মনে করি, যেহেতু বিষয়টি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে একটি বিতর্কের তৈরি হয়েছে, সেহেতু এটি চালু না করাই ভালো হবে। বিনিয়োগকারীরা এটি নিয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, যা স্পষ্ট। তাই বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়াতে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান ‘পিই রেশিও’ ব্যবস্থা বহাল রাখা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে।

এদিকে গত ১৪ জুলাই বিএসইসির ১০২০তম কমিশন সভায় মার্জিন বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাবটি (খসড়া) অনুমোদনের পর থেকেই বাজার নেতিবাচক আচরণ শুরু করেছে। এতে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৫ হাজার ২০০ পয়েন্ট থেকে ৬ হাজার পয়েন্টের ঘরে পৌঁছানোর দ্বারপ্রান্তে এসে নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। বাজার নিম্নমুখী অবস্থানে বাঁক নেওয়ার পেছনে ‘পিবি রেশিও’ প্রস্তাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ ২২ জুলাই ডিএসইএক্স সূচকটি ২৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৮৭১ পয়েন্টে নেমেছে। এদিন তালিকাভুক্ত ৫৮টি বিমা কোম্পানির মধ্যে ৫২টিরই দাম কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ৩টির দাম, আর একটির দাম দিনশেষে অপরিবর্তিত রয়েছে এবং দুটি লেনদেন হয়নি।

মিডওয়ে সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশিকুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমান কমিশন শুরু থেকেই স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে কাজ করার মানসিকতা দেখিয়েছে। আর প্রস্তাবিত ড্রাফটের (খসড়া) ওপর মতামত দেওয়ার জন্য দুই সপ্তাহ সময় রয়েছে। যদি কোনো নিয়ম বাজারের ওপর নেতিবাচক বা অযৌক্তিক প্রভাব ফেলে, তবে বিনিয়োগকারী ও স্টেকহোল্ডারদের উচিত যুক্তিসহ তা কমিশনের কাছে পেশ করা। আশা করা যায়, কমিশন জনস্বার্থে সেই বিষয়গুলো বিবেচনা করবে।

তবে এই বাজার অংশীজন মনে করেন, কমিশনের ড্রাফটটি প্রকাশ করার আগেই কী প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, সেটি বিশ্লেষণ করা উচিত ছিল। শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) বা শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) যেটি ধরেই রেশিও করা হোক না কেন, তাতে কোনো আপত্তি নেই। আবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য যে ‘পিবি রেশিও’ প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি নিয়েও কোনো আপত্তি নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এই রেশিওটি ৩ ধরা হয়ে থাকে। তবে বিমা কোম্পানির জন্য ‘পিবি রেশিও’ ১ প্রস্তাব করার আগে কমিশনের আরও বিশ্লেষণ করা উচিত ছিল। যেহেতু কয়েকটি বাদে সবগুলো বিমা কোম্পানিই এখানে মার্জিন ঋণের সুবিধার বাইরে থাকবে, সেহেতু এটি যৌক্তিক প্রস্তাব হয়নি।

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা প্রথমে যখন কোনো পরিবর্তন দেখতে পাই, তখন সেটি না বুঝতে পেরে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যাই। ‘পিই রেশিও’ আদিকাল থেকে চলে এসেছে এবং এটি সবার কাছে পরিচিত। কিন্তু ‘পিবি রেশিও’ নামটা নতুন শুনে তারা বুঝতে পারছে না, অথচ এটিও একটি ইন্টারন্যাশনাল প্র্যাকটিস। বিষয়টি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি খসড়া মতামতের জন্য দেওয়া হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। মতামত নেওয়ার পর আপনারা যখন ফাইনাল বিধিমালাটি দেখতে পাবেন, তখন বুঝতে পারবেন আমরা কী সিদ্ধান্ত নিলাম।

তিনি বলেন, যেহেতু মার্কেট এটি বুঝতে পারছে না অথবা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে অর্থাৎ মার্কেটে এটার জন্য একটা বড় নেতিবাচক প্রভাব এসেছে, সেহেতু অবশ্যই আমরা এটিকে রিভিউ (পর্যালোচনা) করব। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে সেটি যখন কার্যকর হয়, তখন ‘হিতে বিপরীত’ হয়ে যেতে পারে। আমাদের কমিশন মার্কেটবান্ধব, তাই বিনিয়োগকারীদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না। শুধু এটিই নয়, আরও যদি কোনো বিষয়ে যুক্তিযুক্ত আপত্তি আসে, সেগুলোও আমরা রিভিউ করব।

এমএমএইচ/এমএসএ