বিজ্ঞাপন

আমদানির দাপটে পিছিয়ে দেশীয় কীটনাশক শিল্প

আমদানির দাপটে পিছিয়ে দেশীয় কীটনাশক শিল্প

দেশের কৃষি উৎপাদনে কীটনাশক অপরিহার্য। রোগবালাই, পোকামাকড় ও আগাছা দমনে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার হয়। সরকারি হিসাবে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টন কীটনাশক আমদানি করা হয়। অথচ দেশে এ শিল্পের বিকাশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নীতিগত জটিলতা, কাঁচামাল আমদানিতে বিধিনিষেধ এবং আমদানিনির্ভর বাজার ব্যবস্থার কারণে দেশীয় উৎপাদন প্রত্যাশিতভাবে এগোচ্ছে না বলে অভিযোগ উদ্যোক্তাদের।

দেশীয় উৎপাদকদের মতে, কীটনাশকের কাঁচামাল আমদানিতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা ‘সিঙ্গেল কান্ট্রি, সিঙ্গেল সোর্স’ নীতির কারণে তারা বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে মানসম্মত কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং বাজারে প্রতিযোগিতাও কমছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে কৃষক ও কৃষি খাতে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, পেস্টিসাইড আইন-২০১৮, পেস্টিসাইড রুলস-১৯৮৫ কিংবা বালাইনাশক বিধিমালা-২০১০ কোনোটিতেই আমদানির উৎস সীমিত করার বিধান নেই। একই সঙ্গে এই নীতি আমদানি নীতি আদেশ-২০২২ এর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। এমনকি ২০২১ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় পেস্টিসাইডস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটি (পিটিএসি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, বিদ্যমান আইনে আমদানির উৎস বন্ধ রাখার কোনো বিধান নেই এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া পিটিএসির সুপারিশ বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। চিঠিতে দেশীয় উৎপাদনকারীদের কাঁচামাল আমদানির উৎস উন্মুক্ত রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে নীতিটি শিথিল করে অতিরিক্ত একটি উৎসের অনুমোদন দেওয়া হলেও, তা আমদানি নীতি ও বিদ্যমান আইনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনে অভিযোগ করেছে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যালস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশন (বামা)।

শুধু নীতিগত বাধাই নয়, দ্বন্দ্ব চলছে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েও। বামার অভিযোগ, আমদানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন বেআইনিভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বামার ট্রেড অর্গানাইজেশন (টি অ্যান্ড ও) লাইসেন্স বাতিলের আবেদন করেছে।

এ বিষয়ে বামার সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ নিয়ে চারবার শুনানি হলেও প্রতিবারই জানানো হয়েছে যে আমদানি ও উৎপাদন দুইটি পৃথক ব্যবসা। তাই উৎপাদনকারীদের সংগঠনের লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ নেই। সরকার দুইটি পৃথক সংগঠনের অনুমোদন দিয়েছে, তাই এটি বিলুপ্ত করার দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় আমদানিকারকদের একচেটিয়া প্রভাবের কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারা কাঙ্ক্ষিত নীতিগত সহায়তা পাচ্ছেন না। একটি প্রভাবশালী পক্ষ নিম্নমানের কীটনাশক আমদানি বাড়িয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার করছে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

এদিকে বামার লাইসেন্স বাতিলের আবেদনের বিষয়ে বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, বিষয়টি এখনও পর্যালোচনাধীন রয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য ও শুনানি শেষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কৃষি সংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে কীটনাশক শিল্পের বিকাশ ঘটলে আমদানি নির্ভরতা কমবে, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং স্থানীয় শিল্পের প্রসার ঘটবে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে কৃষিতে ব্যবহৃত অধিকাংশ কীটনাশক আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে দেশে কীটনাশক উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়, তাই এখনই আমদানির বিকল্প নেই। তবে দেশীয় কীটনাশক শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলে ধীরে ধীরে আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। এজন্য উৎপাদনের পথে যেসব নীতিগত ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত দূর করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার কীটনাশকের বাজারের ৯২ শতাংশই বহুজাতিক কোম্পানি ও আমদানিকারকদের নিয়ন্ত্রণে। সরকার ২২টি দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনের অনুমোদন দিলেও তাদের সম্মিলিত বাজার অংশীদারিত্ব মাত্র ৮ শতাংশ।

স্থানীয় উৎপাদকদের প্রত্যাশা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নীতিগত বাধা দূর করা গেলে দেশেই উন্নতমানের কীটনাশক উৎপাদন বাড়বে, কৃষক ভেজালমুক্ত পণ্য পাবেন এবং দেশের কৃষি খাত স্বাবলম্বী হবে।

এসআই/এসএএস