বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সংস্কারের লক্ষ্যে ছয় দফা প্রস্তাব দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, বিদেশি মালিকানা ও বিদেশি বিনিয়োগকে একই বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘লজিস্টিকসে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক নীতিনির্ধারণী গোলটেবিল বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আলোচনায় বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক সভাপতি কবির আহমেদ বলেন, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ফ্রেইট ব্যবসা বর্তমানে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ প্রত্যাশিত বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) নিয়ে আসে না। তাই দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য আরও সহায়ক নীতি প্রয়োজন।
দ্য ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাস্তবতা ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সব খাতে বিদেশি বিনিয়োগ সমানভাবে প্রয়োজনীয় নয়। পরিকল্পনাহীনভাবে বিদেশি অংশগ্রহণ বাড়লে দেশীয় শিল্পের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সাবেক সভাপতি মাহমুদ হোসেন বলেন, অতিরিক্ত বিদেশি অংশগ্রহণ দেশীয় উদ্যোক্তাদের সুযোগ সীমিত করছে, যা ফ্রেইট খাতের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সাবেক সভাপতি এ টি এম আজিজুল হক (ডেভিড) বলেন, উচ্চ সুদের কারণে দেশীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর সুদের হার ২৩ থেকে ২৪ শতাংশে পৌঁছায়। এতে দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন, আর বিদেশি প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ছাড়াই সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
গোলটেবিলে উপস্থাপিত নির্বাহী সারসংক্ষেপে বলা হয়, বিদেশি মালিকানা ও বিদেশি বিনিয়োগ এক বিষয় নয়। উৎপাদনশিল্পের মতো লজিস্টিকসের সেবানির্ভর উপখাতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের স্থায়ী মূলধন বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। তারা শাখা অফিস বা যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশ করতে পারে। বিপরীতে ওয়্যারহাউজ, ডিপো, যানবাহন ও অন্যান্য অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেন মূলত দেশীয় উদ্যোক্তারা।
লিখিত ধারণাপত্রে আরও বলা হয়, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, শিপিং এজেন্সি, কুরিয়ার-এক্সপ্রেস এবং কাস্টমস এজেন্ট (সিঅ্যান্ডএফ) খাতে বিদেশি মালিকানার সুযোগ থাকলেও উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোগত বিনিয়োগের নজির সীমিত। ফলে অবকাঠামো গড়ে তুলেও দেশীয় উদ্যোক্তারা ব্যবসার বড় অংশ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চালান থেকে অর্জিত মুনাফার বড় অংশ বিদেশে চলে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাও কমছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এসময় ছয় দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, লজিস্টিকসের চারটি উপখাতে অভিন্ন ৬০:৪০ ইকুইটি কাঠামো বজায় রাখা এবং পরিচালনায় দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান বিধির কঠোর ও অভিন্ন প্রয়োগ, বিদেশি অংশীদারিত্বযুক্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধিত মূলধন বাধ্যতামূলক করা এবং এর একটি অংশ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের লক্ষ্যে বিদেশি নিয়োগ সীমিত রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ মূল্যায়নকে লাইসেন্সের পূর্বশর্ত করা এবং যৌথ উদ্যোগের ক্ষেত্রে প্রকৃত দেশীয় অংশীদার ও সুবিধাভোগী মালিকানা নিশ্চিত করা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। বিশেষ অতিথি ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এবং নওগাঁ ৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা।
আরএইচটি/এমএসএ
