আগামী আগস্ট থেকে দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর সেবার মান (কোয়ালিটি অব সার্ভিস) নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যের অবসান ঘটিয়ে সব মোবাইল অপারেটররাও এ বিষয়ে একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর হোটেল শেরাটনে গ্রামীণফোনের ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি’ কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব তথ্য জানিয়েছেন।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রায় তিন দশক আগে দেশে ডিজিটাল যোগাযোগের যাত্রা শুরু হয়েছিল টেলিফোনভিত্তিক ছোট ছোট প্রকল্পের মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছে, বদলেছে চ্যালেঞ্জও। এখন ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে দেখতে হবে। ডিজিটাল বিভাজনের কোনো স্থির সংজ্ঞা নেই। কারণ, সময়ের সঙ্গে এর রূপ বদলেছে। শুরুতে ধারণা ছিল, নেটওয়ার্ক কভারেজের অভাবই এ বিভাজনের মূল কারণ। পরে দেখা গেছে, শুধু কভারেজ নয়, কার্যকর সংযোগ বা কানেক্টিভিটিই বড় বিষয়। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সক্ষমতা বা ‘ইউসেজ গ্যাপ’। ভবিষ্যতে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই হবে না, ইন্টারনেটের মান বা গুণগত সেবাও ডিজিটাল বিভাজনের অন্যতম নির্ধারক হয়ে উঠবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রসারের ফলে উচ্চমানের ইন্টারনেটের চাহিদা আরও বাড়বে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার অন্তত মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে, যা কভারেজ ঘাটতি অনেকটাই দূর হওয়ার প্রমাণ। তবে জেলা পর্যায়ে এখনো বৈষম্য রয়েছে। কভারেজের দিক থেকে ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম এগিয়ে থাকলেও পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রাম পিছিয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় সব পরিবার মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় এলেও ব্যক্তিগতভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন মাত্র ৬৫ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষের নিজস্ব মোবাইল সংযোগ নেই। একইভাবে, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪৪ থেকে ৪৭ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আবার পরিবারভিত্তিক হিসেবে ৫৫ থেকে ৫৬ শতাংশ পরিবার ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও এর মধ্যে মাত্র ৩৬ শতাংশ পরিবারের ফিক্সড ব্রডব্যান্ড সংযোগ রয়েছে। বাকি প্রায় ২০ শতাংশ পরিবার মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মোবাইল ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করেন, যা একটি বড় ধরনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।
এ ছাড়া, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গ, অঞ্চল ও শারীরিক সক্ষমতার ভিত্তিতেও বৈষম্য রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, শহরে যেখানে ৭৫ থেকে ৭৭ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, সেখানে গ্রামে এ হার মাত্র ৪২ থেকে ৪৪ শতাংশ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ইন্টারনেট ব্যবহারের হার সক্ষম ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ।
সরকারের চলমান উদ্যোগের কথা তুলে ধরে এমদাদ উল বারী বলেন, গ্রামীণ এলাকায় উন্নত ফোর-জি সেবা পৌঁছে দিতে ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম নিলাম সম্পন্ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণ নিয়েও নতুন করে গবেষণা করছে বিটিআরসি। দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল অপারেটররা স্পেকট্রামের মূল্য বেশি বলে আসছেন। সরকারও বিষয়টি উপলব্ধি করেছে। তবে স্পেকট্রামের দাম কমালে সরকারের রাজস্ব কীভাবে সর্বোচ্চ করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বরে স্পেকট্রাম নবায়নের আগে এ বিষয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য সুপারিশ সরকারের কাছে তুলে ধরতে চায় বিটিআরসি।
সেবার মান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এটি ডিজিটাল বিভাজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠবে। গত বছর বিটিআরসি সেবার মান পরিমাপের নির্দেশিকা আধুনিকায়ন করেছে। এরপর দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে সম্প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সব মোবাইল অপারেটর সেবার মান পরিমাপের একটি অভিন্ন মানদণ্ডে একমত হয়েছে। এর ফলে আগামী আগস্ট থেকে দেশব্যাপী মোবাইল অপারেটরগুলোর সেবার মান নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
ইন্টারনেটের দাম প্রসঙ্গে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের ইন্টারনেটের দাম বিশ্বের গড়ের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ কম। বিশ্বের সবচেয়ে কম দামের ইন্টারনেট থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১ বা ১২তম। তবে আঞ্চলিকভাবে ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ইন্টারনেটের দাম আরও কম। তাই দেশের গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেটের মূল্য আরও কমানোর সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। অনুষ্ঠানে গ্রামীণফোনের এনভায়রনমেন্ট, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (ইএসজি) বিভাগের প্রধান ফারহানা ইসলাম এবং ডিজিটাল ইনক্লুশন লিড তাজরিবা খুরশীদ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
পরে আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস, জিএসএমএর সিনিয়র মার্কেট এনগেজমেন্ট ম্যানেজার গগনদীপ মনচান্দা, টেলিনর এশিয়ার চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মনীষা ডোগরা, গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ এবং চিফ মার্কেটিং অফিসার ফারহা নাজ জামান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইয়াসির আজমান উদ্যোগটির সুবিধাভোগী— পিয়ালী সিনহা, শানু আক্তার, মোনালিসা আক্তার ইরিন ও অন্তরা আক্তারের সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নেন।
আরএইচটি/এসএএস
