আর্থিক সংকট মোকাবিলায় গঠিত নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি তাদের সার্বিক কার্যক্রম ও নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছে। পাঁচটির মধ্যে প্রথম ব্যাংক হিসেবে এক্সিম ব্যাংক পূর্ণাঙ্গভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে নতুন পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সংকট কাটিয়ে ব্যাংকটির আবার স্বাভাবিক কর্পোরেট ব্যবস্থাপনায় ফিরে আসার আনুষ্ঠানিক পথ সুগম হলো।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) এক্সিম ব্যাংক থেকে নিয়োজিত প্রশাসক শওকাতুল আলম ও তার প্রতিনিধিদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ঢাকা পোস্টকে জানান, পাঁচটির মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসক প্রত্যাহার করে নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু পূর্ণাঙ্গ এমডি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, এখন থেকে তার অধীনে ব্যাংক পরিচালনা হবে। ফলে খুব দ্রুতই বাকি চার ব্যাংকের প্রশাসক সরিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে পাঁচটি ব্যাংকের সার্বিক দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার পর একই ব্যাংকে প্রশাসক বহাল রাখার কোনো প্রশাসনিক যৌক্তিকতা থাকে না। একটি প্রতিষ্ঠানে একই সঙ্গে দুটি আলাদা কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রশাসক যৌথভাবে পরিচালনা করতে পারে না। ফলে নিয়ম অনুযায়ী প্রশাসক তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, প্রথম ব্যাংক হিসেবে এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া এমডি মূল প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনায় এক্সিম ব্যাংকের কার্যালয় ব্যবহার করবেন। তাই এক্সিম ব্যাংকের দায়িত্ব আগে পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য ব্যাংকগুলোর প্রশাসক প্রত্যাহার করা হবে এবং আগামী আগস্টের মধ্যে বাকি চার ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসবে।
এই একীভূতকরণ ও প্রশাসনিক রূপান্তর প্রক্রিয়াকে বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান। তিনি ঢাকা পোস্টকে জানান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এই পুনর্গঠন সফল করা আবশ্যক, তা না হলে পুরো ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে ব্যাংকটিকে শক্ত ভেতের ওপর দাঁড় করাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে এবং এ কাজের জন্য তিনি সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এক্সিম ব্যাংক ছিল ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। আর বাকি চারটি ব্যাংক—সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক ছিল চট্টগ্রামের বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের দখলে। পরবর্তী সময়ে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তৈরি হওয়া আর্থিক বিপর্যয় সামাল দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একত্রিত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করে।
একীভূত এই ব্যাংকটি ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের জমানো টাকার বিপরীতে শেয়ারে রূপান্তর করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংকগুলো কাগজে-কলমে একীভূত হলেও প্রযুক্তিগত ও প্রক্রিয়াগত নানা জটিলতা এখনও বিদ্যমান। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর আইটি ব্যবস্থা পুরোপুরি একীভূত করার কাজ এখনও শেষ হয়নি। ফলে বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে তাদের পুরনো নামেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিদেশের ব্যাংকে রক্ষিত 'নস্ট্রো' হিসাবের লেনদেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। প্রযুক্তিগত এই সমন্বয় শেষ হলেই পাঁচ ব্যাংকের পৃথক পরিচিতি মুছে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একক নামে 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক' হিসেবে পূর্ণাঙ্গ পথচলা শুরু হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে শিগগিরই ব্যাংকটির পক্ষ থেকে নতুন নতুন আমানত ও ঋণ প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এসআই/এসএম
