দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত বাতিল, পুনর্বহাল এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বাধীন তদন্ত দাবি জানিয়েছেন চাকরিচ্যুত। তবে ডিএসই বলছে, সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ শ্রম আইন ও প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস রুল অনুসরণ করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ২ আগস্ট এ বিষয়ে ডিএসইর এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, আইন ও প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি অনুসরণ করেই তাদের চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পুনর্বহাল চেয়ে পুরো প্রক্রিয়ার স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছেন।
চাকরিচ্যুত কর্মীদের দাবি, ডিএসই ‘অর্গানাইজেশনাল ট্রান্সফরমেশন’-এর কথা বললেও এ–সংক্রান্ত কোনো লিখিত বা অনুমোদিত পরিকল্পনা কর্মীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ, কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই ‘পজিশন উইল নো লংগার বি রিকোয়ার্ড’ উল্লেখ করে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
এক্সচেঞ্জেস ডিমিউচুয়ালাইজেশন অ্যাক্ট, ২০১৩-এর ধারা ১৮(ছ) অনুযায়ী ২০১৩ সালের আগে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের চাকরির ধারাবাহিকতা ও অর্জিত সুবিধা সংরক্ষিত। পাশাপাশি ডিএসই পরিচালনা পর্ষদের ৭৮৯তম সভায় (৬ জানুয়ারি ২০১৫) পুরোনো কর্মীদের অবসরের বয়স ৬৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাই আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া চাকরিচ্যুতি আইন ও বোর্ডের সিদ্ধান্তের পরিপন্থি বলে তারা দাবি করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অতিরিক্ত দুই মাসের বেতন দেওয়াকে ‘মানবিক উদ্যোগ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এতে চাকরিচ্যুত কর্মীদের পেশাগত ও সামাজিক ক্ষতিপূরণ হয় না। তারা আরও দাবি করেন, ধারাবাহিকভাবে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করায় কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, যা পুঁজিবাজারের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিএসইর ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর’ অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন চাকরিচ্যুত কর্মীরা। তাদের দাবি, তারা দালিলিক প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই বক্তব্য তুলে ধরছেন। একই সঙ্গে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে প্রত্যাখ্যান করে কোনো ধরনের চূড়ান্ত পাওনা (ফাইনাল সেটেলমেন্ট) গ্রহণ না করেই আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে ডিএসইর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও ভবিষ্যৎ-উপযোগী করতে ২০২২ সাল থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক রূপান্তর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কিছু পদ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে এবং মোট ৩৫০ কর্মীর মধ্যে ১৭ জনের চাকরির অবসান ঘটানো হয়েছে, যা মোট জনবলের ৫ শতাংশেরও কম।
ডিএসইর দাবি, সিদ্ধান্তটি কোনো ব্যক্তিগত বিবেচনায় নয়; প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন, কার্যকারিতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬–এর ২৬ ধারা এবং প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস রুল অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। ওই ধারায় নোটিশ বা নোটিশের পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ দিয়ে কারণ উল্লেখ ছাড়াই চাকরির অবসানের সুযোগ রয়েছে।
ডিএসই আরও জানায়, আইন অনুযায়ী চার মাসের বেতনের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠান মানবিক বিবেচনায় অতিরিক্ত দুই মাসের বেতন দিয়েছে। এ ছাড়া চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, অব্যবহৃত ছুটির নগদায়নসহ সব প্রাপ্য সুবিধা পরিশোধ করা হবে। ইতোমধ্যে এসব অর্থ বুঝে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিএসই আরও দাবি করে, পুরো প্রক্রিয়ায় কর্মীদের ব্যক্তিগত মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে এবং তাদের অভিজ্ঞতার সনদসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে চাকরিচ্যুতির পর কিছু ব্যক্তি অসম্পূর্ণ তথ্য ও প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে বক্তব্য দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করে প্রতিষ্ঠানটি।
জুন মাসের বিভিন্ন সময়ে ১৭ কর্মকর্তার চাকরির অবসান ঘটে। এর প্রতিবাদে গত ২ আগস্ট মতিঝলে ডিএসইর পুরোনো ভবনের সামনে মানববন্ধন করেন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ বিষয়ে এর আগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকে বলা হয়, ডিএসই একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কর্মী নিয়োগ বা চাকরিচ্যুতির এখতিয়ার প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব।
চাকরিচ্যুত কর্মীরা অবিলম্বে ১৭ জন কর্মকর্তাকে স্বপদে পুনর্বহাল, পুরো প্রক্রিয়ার স্বাধীন তদন্ত এবং ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন ও বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের স্বীকৃত অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে ডিএসই বলছে, প্রতিষ্ঠানটি আইন, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নীতি অনুসরণ করেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
এমএমএইচ/এসএম
