দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা, বিনিয়োগ সুরক্ষা ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং তারল্য সংকটের এই কঠিন সময়ে দেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ সুরক্ষা ও রপ্তানি ধরে রাখতে কাঁচামাল আমদানিতে এই মূল্য সংযোজন জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এই দাবি জানান।
রোববার (৯ আগস্ট) এ তথ্য জানা গেছে। একই দাবি জানিয়েছে পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।
সংগঠনগুলো বলছে, সম্প্রতি বাজেট প্রণয়নের সময় নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক গ্যারান্টি মাধ্যমে আমদানিকৃত কাঁচামালের বিপরীতে মূল্য সংযোজনের শর্তে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ প্রাইমারি টেক্সটাইল খাত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রধান পশ্চাৎ-সংযোগ হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় মিলগুলো যদি পোশাক শিল্পের প্রয়োজনীয় সুতা ও কাপড়ের জোগান দিতে না পারে, তবে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তাই ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত বজায় থাকলে স্থানীয় উৎপাদন ও শিল্পের বিকাশ নিশ্চিত হবে।
অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানির বিপরীতে রপ্তানিদ্রব্য পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা থাকায়, আমদানিকারকরা কী পরিমাণ মূল্য সংযোজন করছেন তার ওপর নজরদারি রাখা সহজ হয়। এটি কোনো ধরনের কারচুপি বা বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের পথও বন্ধ করতে সহায়তা করে।
বর্তমান দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে প্রায় ১ হাজার ৮৮৩টি সদস্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এ খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিশাল বিনিয়োগকে রক্ষা করতে এবং বিশ্ববাজারে টেকসই অবস্থানের জন্য মানসম্মত পণ্য উৎপাদন ও স্থানীয় মূল্য সংযোজন অপরিহার্য বলে মনে করছে সংগঠনগুলো।
সংগঠনগুলোর যৌথ প্রস্তাবনায় শুধু মূল্য সংযোজন নয়, বরং পুরো রপ্তানি খাতের ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে নগদ সহায়তার বিপরীতে বর্তমানে উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটিকে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করার দাবি।
সংগঠনগুলোর আরও দাবি মধ্যে রয়েছে- গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া। এই ঋণের ওপর ১২ শতাংশ ‘কাল্পনিক’ সুদের বিপরীতে কর আরোপ করা হলে প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এই ধারা থেকে রপ্তানিমুখী শিল্পকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
কর আইন অনুযায়ী উৎসে কর কর্তন বা জমা দিতে ভুল হলে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ জরিমানার বিধান রয়েছে। ব্যবসায়িক ভুল বা অসাবধানতাকে অপরাধ হিসেবে না দেখে এই জরিমানা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।
পোশাক শিল্পের মতোই টেক্সটাইল খাতের আয়কর হার ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে তা ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বহাল রাখার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা যায়।
এবং আয়কর আইনের ৭২ক ধারা অনুযায়ী ১২ বছর পর্যন্ত নথিপত্র সংরক্ষণের বিধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল। এটি ভ্যাট ও কাস্টমস আইনের সাথে সমন্বয় করে ৩ বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে প্রস্তাবনায়।
সংগঠনগুলোর মনে করে, প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন পোশাক শিল্পের মূল কাঁচামাল সরবরাহকারী মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে তেমনি নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে। বর্তমান তারল্যসংকট, উচ্চ সুদের হার এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এনবিআরের ইতিবাচক পদক্ষেপই পারে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে তার হারানো প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে।
আরএম/এমএন
