বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে যে প্রতিবন্ধকতার কথা জানাল মার্কিন প্রতিনিধিদল

বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে যে প্রতিবন্ধকতার কথা জানাল মার্কিন প্রতিনিধিদল

বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশে সফররত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধিদল। ওইসব প্রতিবন্ধকতা দূর হলে তারা বাংলাদেশে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী রয়েছেন বলে জানান।

বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলের শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩ সদস্যের বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির। এসময় মন্ত্রী মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সমস্যার কথা শুনে তা সমাধানের আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদলে অ্যাপলের পক্ষে প্রিসিলা কোল (যিনি এই অঞ্চলের সরকারি বিষয়াবলি দেখাশোনা করেন) বলেন, অ্যাপলের পার্টনাররা বাংলাদেশে দীর্ঘ বছর ধরে আইফোন আমদানি করে; যার সঙ্গে উচ্চমাত্রার শুল্ক যুক্ত থাকে। অ্যাপলের প্রধান উদ্বেগ হলো- বাংলাদেশে ডিভাইসের সমান্তরাল আমদানি। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ সরকারকে শুল্ক না দিয়েই স্মার্টফোন নিয়ে আসছে, যাকে অ্যাপল ‘গ্রে মার্কেট’ হিসেবে অভিহিত করে। বর্তমানে এই ‘গ্রে মার্কেট’ অ্যাপলের অফিসিয়াল বিক্রির সংখ্যার সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতা করছে বলে তার দাবি।

প্রিসিলা কোল জানান, অ্যাপল বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। কিন্তু বিক্রির পরিমাণ পর্যাপ্ত না হওয়ায় অভ্যন্তরীণভাবে সেই বিনিয়োগের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। গ্রে মার্কেটের কারণে অফিসিয়াল বিক্রির সংখ্যা কম দেখাচ্ছে, যা অ্যাপলের বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এই অবৈধ আমদানির ফলে বাংলাদেশ সরকার বিপুল পরিমাণ শুল্ক বা রাজস্ব হারাচ্ছে বলেও দাবি করেন প্রিসিলা কোল। পাশাপাশি অ্যাপল সরকারের সাথে মিলে এই সমান্তরাল আমদানি বা গ্রে মার্কেটের পরিমাণ কমিয়ে আনতে চায় বলে জানান। বলেন, এতে করে অ্যাপল বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে এবং সরকারও আরো বেশি পরিমাণ শুল্ক আদায় করতে পারবে।

কর্টেভা এগ্রিসাইন্স বাংলাদেশের সরকার ও শিল্প-সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলির দক্ষিণ এশিয়া প্রধান নিতু কাপাশি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক এই কোম্পানিটির বাংলাদেশে ৪৩ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। যারা মূলত উন্নত মানের বীজ এবং শস্য সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে।

নিতু কাপাশি জানান, আগে তারা বি-টু-বি মডেলে কাজ করলেও গত কয়েক বছর ধরে সরাসরি কৃষকদের সাথে (বি টু সি) মডেলে কাজ শুরু করেছে। এই সময়ে তারা সরাসরি ৪০ হাজারের বেশি কৃষকের কাছে পৌঁছেছে এবং তাদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, কর্টেভা গবেষণার পেছনে প্রতিদিন প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। বাংলাদেশে তারা কেবল প্রবেশ নয়; বরং বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করতে চায়।

গত ৪ বছর ধরে তাদের ৫টি পণ্য সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় আটকে আছে উল্লেখ করে কর্টেভা এগ্রিসাইন্স বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রধান অভিষেক দাস বলেন, তারা প্রতিটি দপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা পাননি। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পণ্যগুলোর জন্য একটি ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ বা দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া চালুর পরামর্শ দেন তিনি। যাতে পণ্যের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই সাপেক্ষে দ্রুত বাজারে আনা যায়।

পাশাপাশি সরকার এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করার পরামর্শ দিয়ে অভিষেক দাস বলেন, যেখানে বৈশ্বিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য বিনিময় করা সম্ভব হবে। তার মতে, অনুমোদনের এই অনিশ্চয়তার কারণে গ্লোবাল বোর্ডের কাছে বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বাজার সম্প্রসারণের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই, বাংলাদেশ সরকারের কাছে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার এবং কৃষি খাতকে আধুনিকীকরণে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।

প্রতিনিধি দলে একজন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য এই মূহুত্বে ইউরোপের বাজার ধরে রাখতে গুরুত্ব বাড়ানো উচিত। বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত পোশাকের অর্ধেকই ইউরোপের বাজারে যায়। বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে এলডিসি থেকে উত্তরণ বা গ্র্যাজুয়েশন লাভ করতে যাচ্ছে। তখন ইউরোপের বাজারে প্রাপ্ত বাণিজ্যিক সুবিধা যেন বাংলাদেশ না হারায় সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য এখনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) সম্পাদনের বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর কারখানাগুলোর নিরাপত্তার মান উন্নত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সরকার অতীতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের নিরাপত্তা মান বিশ্বের অন্যতম সেরা এবং নিরাপদ। তবে, বহুতল বিশিষ্ট কারখানাগুলোতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার এবং সরকারের সাথে অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। গত ১৩ বছরে বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও পরিদর্শকদের তদারকিতে কিছুটা শিথিলতা দেখা গেছে।

এই বক্তা আরোা বলেন, পোশাক শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষায় নতুন যে শ্রম আইন করা হয়েছে, তার সঠিক প্রয়োগের জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন করা দরকার। যাতে আইনটি প্রতিটি কারখানায় কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও বলবৎ করা যায়।

এছাড়া বৈঠকে মেটা, পাঠাও, স্টার্ন্ডার্ড চার্টার্ড, ভিসা, উবার, এইচএসবিসি, মাস্টারকার্ড ও মেটলাইফের প্রতিনিধিসহ আরো কয়েকটি মার্কিন কোম্পানির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এমএমএইচ/বিআরইউ