বিজ্ঞাপন

৬ হাজার মাইক্রো ইকোনমিক জোনের প্রস্তাব

স্থানীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা

স্থানীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা

দেশের স্থানীয় উৎপাদন, উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে সারা দেশে ৬ হাজার ‘মাইক্রো ইকোনমিক জোন’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান ‘আর্কিটেকচার রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট’। এসব জোনে একই সঙ্গে উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, আবাসন, প্রশিক্ষণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির আর্কিটেক্ট শামসুন্নাহার মুন্নি। 

তিনি বলেন, ‘৬ হাজার মাইক্রো ইকোনমিক জোন’ শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম। এর মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের প্রয়োজন যতটা সম্ভব স্থানীয়ভাবে পূরণ করা। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।

শামসুন্নাহার মুন্নি বলেন, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তাই দেশের মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য কতটা স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও ব্যবহার করা যায়, সেই সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি বলেন , ‘আমরা লোকালি এবং গ্লোবালি কাজ করব। স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যাগুলো স্থানীয়ভাবেই সমাধান করতে পারলে দেশের বড় অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

প্রস্তাবিত মাইক্রো ইকোনমিক জোনে মানুষ শুধু ভোক্তা হিসেবে থাকবে না, উৎপাদক হিসেবেও যুক্ত হবে বলে জানান তিনি। একজন কৃষকের উৎপাদিত পণ্য অন্য উদ্যোক্তা ব্যবহার করবেন, আবার অন্য উদ্যোক্তার তৈরি পণ্য কৃষক বা স্থানীয় মানুষ ব্যবহার করবেন। এভাবে একটি পারস্পরিক নির্ভরশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, গ্রামের পুরোনো বিনিময়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আদলে স্থানীয় উৎপাদক, কারিগর, কৃষক, প্যাকেজিং উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা হবে। ‘আমরা অন্য কোনো দেশের মতো হতে চাই না। আমরা আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী আমাদের মতো করে এগোতে চাই।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রস্তাবিত ৬ হাজার মাইক্রো ইকোনমিক জোনের আওতায় থাকবে ৬ হাজার কোল্ড স্টোরেজ, এয়ারফ্লো স্টোরেজ, অ্যাগ্রো প্রসেসিং সেন্টার, ড্রায়ার ইউনিট ও ফুড প্রসেসিং ইউনিট। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব আবাসন, উদ্যোক্তাদের ওয়ার্কস্পেস, উৎপাদন সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও ইনকিউবেশন সেন্টার, স্টোর, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাও থাকবে।

এ ছাড়া প্রতিটি জোনে ছোট পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার পরিকল্পনাও রয়েছে। উইন্ডমিল, মিনি হাইড্রোপাওয়ারসহ কম কার্বন ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছে।

আর্কিটেক্ট বলেন, একটি জোনে ১০০ জন উদ্যোক্তা যুক্ত হলে ৬ হাজার জোনে প্রায় ৬ লাখ উদ্যোক্তা সরাসরি যুক্ত হতে পারেন। এ সংখ্যা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রাথমিক জরিপে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে প্রায় ২৭০ জন উদ্যোক্তার সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। 

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও এলাকায় সরেজমিন জরিপ করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপন ও জীবিকার বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করেই এই মাস্টার প্ল্যানের ধারণা তৈরি হয়েছে।

নিজেকে ‘গরিবের আর্কিটেক্ট’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি দরিদ্র পরিবারের বাড়ি নির্মাণে কাজ করেছি। এসব কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই প্রান্তিক মানুষের আবাসন, কর্মসংস্থান ও জীবিকার প্রয়োজনকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার চিন্তা এসেছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক প্রান্তিক মানুষ বসতবাড়ির মধ্যেই ছোট পরিসরে ব্যবসা বা উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাই প্রস্তাবিত জোনে আবাসনকে শুধু বসবাসের জায়গা হিসেবে নয়, ‘ইকোনমিক হাউজিং’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ বসবাসের পাশাপাশি সেখানে আয়-উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ থাকবে।

শামসুন্নাহার মুন্নির মতে, দেশের বড় সমস্যা অর্থের অভাব নয়, বরং বিভিন্ন সম্পদ, দক্ষতা, পণ্য, উদ্যোক্তা ও বাজারকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে না পারা। এই ‘কানেক্টিভিটি গ্যাপ’ দূর করাই মাইক্রো ইকোনমিক জোনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, গাজীপুরে নিজেদের উদ্যোগ ও করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) ফান্ডের মাধ্যমে একটি মডেল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে প্রাথমিকভাবে ২০ জন উদ্যোক্তাকে নিয়ে মডেলটি তৈরি করা হচ্ছে। রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ বিভিন্ন এলাকাতেও এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে।

সরকারের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, এই মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নে সরকারের কারিগরি দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

এ ছাড়া সিএসআর ফান্ড, ব্যক্তিগত বিনিয়োগ, অংশীদারত্বের মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

শামসুন্নাহার মুন্নি বলেন, ‘এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প নয়। এটি একটি কান্ট্রি প্রজেক্ট। দেশের সবাই মিলে এটি বাস্তবায়ন করতে পারে।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অর্গানিক প্রোডাক্ট অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক 

নাসীরুল ইসলাম, পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদুর রহমান পাপন ও গ্রিন বিল্ডিং অ্যাকাডেমির সভাপতি প্রকৌ. মো. আল এমরান হোসেন প্রমুখ।

এমএসআই/আরএফ