বিজ্ঞাপন

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ১৮০ দিনে যেসব উদ্যােগ নিয়েছে সরকার

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ১৮০ দিনে যেসব উদ্যােগ নিয়েছে সরকার

গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মাধ্যমে বাজারের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো, কারসাজি ও অনিয়ম ঠেকানো, ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানিয়েছে, সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষ্যে এসব উদ্যােগের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাজার সংস্কারে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বিনিয়োগ শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

ফ্লোর প্রাইস তুলে স্বাভাবিক লেনদেনের পথ তৈরি

বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন ফিরিয়ে আনতে শেয়ারের ওপর আরোপ করা ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্যস্তর প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০২২ সালের ২৮ জুলাই বাজারের পতন ঠেকাতে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়েছিল। এতে নির্ধারিত দামের নিচে শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেনের সুযোগ ছিল না। দীর্ঘদিন এ ব্যবস্থা বহাল থাকায় অনেক শেয়ারের লেনদেন কমে যায় এবং বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অধিকাংশ কোম্পানির ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়। সর্বশেষ ৯ জুন থেকে সব কোম্পানির ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে শেয়ারের দাম বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কারসাজি ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি

পুঁজিবাজারে কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং ও অন্যান্য অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এ জন্য বাজারসংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যব্যবস্থার সমন্বয় ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে অনিয়মের তথ্য প্রকাশকারীদের বা হুইসেল ব্লোয়ারদের সুরক্ষায় পৃথক বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ

পুঁজিবাজারের গভীরতা ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে ভালো মৌলভিত্তির দেশীয়, বহুজাতিক ও সরকারি কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। লাভজনক সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তি বা ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে বাজারে আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে বাজারে মানসম্পন্ন শেয়ারের সংখ্যা বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও সংস্কার পরিকল্পনায় রয়েছে।

বন্ড, সুকুক ও ইটিএফ বাজার সম্প্রসারণ

শুধু শেয়ারনির্ভর বাজারের পরিবর্তে একটি বহুমাত্রিক পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে করপোরেট বন্ড, সুকুক, গ্রিন বন্ড ও এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফ-এর বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে টেকসই বন্ড কাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বন্ড ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পণ্যের বাজার বড় হলে অবকাঠামো ও শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে পুঁজিবাজার অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি কার্যকর উৎস হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ডিজিটাল হচ্ছে নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম

প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আবেদন, বন্ড ও সুকুক অনুমোদন এবং লাইসেন্সিংসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম ধাপে ধাপে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া, বিও হিসাব খোলা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনবোর্ডিং প্রক্রিয়াও আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময় কমানো, তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে বিএসইসি।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই মূল লক্ষ্য

পুঁজিবাজার সংস্কারের এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল বাজার গড়ে তোলা। সরকারের ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যেও ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ভালো সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা, হুইসেল ব্লোয়ার সুরক্ষা, পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন ও বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন এবং এআই-ভিত্তিক নজরদারির মতো উদ্যোগের কথা রয়েছে। 

তবে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু নীতিমালা ও প্রযুক্তিগত সংস্কার যথেষ্ট নয়; এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তার ওপরই পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করবে। কারসাজি ও অনিয়মের দ্রুত বিচার, তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসন নিশ্চিত করা, ভালো কোম্পানি বাজারে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ কার্যকরভাবে রক্ষা করা গেলে সংস্কারের সুফল দীর্ঘমেয়াদে দৃশ্যমান হতে পারে।

এমএমএইচ/এসএএস