বিজ্ঞাপন

সিপিডি

পোশাক কারখানার ছাদে মিলতে পারে ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ

পোশাক কারখানার ছাদে মিলতে পারে ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ

তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে প্রায় ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতকে বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

সংস্থাটির গবেষণা বলছে, ওই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন হবে প্রায় ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ। যা দিয়ে পোশাক খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব।

আজ (বৃহস্পতিবার) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সিপিডি আয়োজিত ‘পোশাক খাতের শিল্প কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: চীনা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে।

অনুষ্ঠানে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রুফটপ সোলার ইন আরএমজি সেক্টর’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আবরার আহমেদ ভূইয়া ও প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট নূর ইয়ানা জান্নাত। 

গবেষণায় দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ৩৫০টি কারখানায় সরাসরি সমীক্ষা চালানো হয়েছে, যা দেশের মোট পোশাক কারখানার প্রায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

গবেষণায় বলা হয়, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অথচ তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। এ পরিস্থিতিতে শিল্পের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণের সুযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে পোশাক খাতে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাত্র ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসছে।

সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সম্ভাবনা ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৮৭৮টি কারখানার ওপর চালানো সমীক্ষায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার খুবই সীমিত বলে উঠে এসেছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, রুফটপ সোলারের মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটের গড় খরচ মাত্র ৩ টাকা ৪ পয়সা। যা জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের দামের অর্ধেকেরও কম।

এ কারণে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প কারখানার বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ রয়েছে।

গবেষণায় ৩০০ কিলোওয়াট বা তার বেশি সক্ষমতার ২ হাজার ৩০৩টি কারখানাকে রুফটপ সোলারের জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারখানায় সৌর প্যানেল স্থাপনে প্রায় ১৮৮ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প খাত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের মধ্যে রয়েছে। অনেক আগে থেকেই শিল্প কারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা গেলে বর্তমান সংকট আরও কমানো সম্ভব হতো।

তিনি বলেন, পোশাক খাত ধীরে ধীরে রুফটপ সোলারের দিকে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। একদিকে এটি জ্বালানি চাপ কমাচ্ছে, অন্যদিকে ডিকার্বনাইজেশনের প্রতিশ্রুতি পূরণেও সহায়তা করছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পোশাক খাতে সব মিলিয়ে প্রায় ৯ দশমিক ৭ মিলিয়ন বর্গমিটার জায়গা রয়েছে, যেখানে রুফটপ সোলার বসানোর সুযোগ রয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মাত্র ১৮৮ মিলিয়ন ডলার হলেই চলবে। খুব বেশি টাকা দরকার নেই। রুফটপকে সোলারভিত্তিক জেনারেশনে রূপান্তরের জন্য আমাদের আরও বেশি রিসোর্স প্রয়োজন নেই।’

তার মতে, সব কারখানা এখনই সৌরবিদ্যুতে যেতে প্রস্তুত নয়। প্রায় ৫০০ কারখানা এখনই বিনিয়োগ করতে পারে। আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০ কারখানা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে এ খাতে যেতে পারবে। তবে ৪০০টির বেশি কারখানায় আরও বেশি ধরনের সহায়তা ও নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

গবেষণায় আরও বলা হয়, বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি হলে শিল্পের রুফটপ সোলার প্রকল্পগুলো ব্যাংকের কাছে বিনিয়োগযোগ্যতা হারায়। ফলে এ খাতে সবুজ অর্থায়ন বা রেয়াতি ঋণের ধারাবাহিকতা জরুরি। বিনিয়োগের শর্তগুলো পরিবর্তন করা গেলে সৌর বিদ্যুতে যেতে প্রস্তুত কারখানার সংখ্যা আরও বাড়বে। বিশেষ করে সাড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি সুদে গ্রিন ফাইন্যান্স পাওয়া গেলে তা সবচেয়ে ভালো হবে।

সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, এইচঅ্যান্ডএম, ইনডিটেক্স, ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও এমঅ্যান্ডএসের মতো বৈশ্বিক ক্রেতারা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

গ্রিড বিপর্যয় ও গ্যাস সংকটে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার জন্যও পোশাক খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। এতে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ এবং পুরো জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।

তিনি বলেন, কারখানার ছাদ দিয়ে পুরো জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। অধিকাংশ কারখানা বহুতল হওয়ায় ছাদের জায়গা সীমিত।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, জিরানি বাজারে তাদের একটি কারখানার ছাদে মাত্র ২৭২ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ পাওয়া গেছে। অথচ ওই কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় দেড় মেগাওয়াট।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য শক্তি ফোরামে পোশাক খাতের রুফটপ সোলারে চীনা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়। যেখানে বলা হয়, চীনের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সহজ অর্থায়ন কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের শিল্প খাতে রুফটপ সোলারের বিস্তার আরও দ্রুত করা সম্ভব। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত শর্ত পূরণসব মিলিয়ে পোশাক খাতে রুফটপ সোলার এখন কেবল বিকল্প জ্বালানি নয়, বরং ভবিষ্যৎ শিল্প প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কান্ট্রি লিয়াজোঁ নুসরাত জাহান, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও অপারেশন) স্বপন বনিক, বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআর) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জাহিদুল আলম, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মিনহাজুল হকসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আরএম/বিআরইউ/এনএফ