বিজ্ঞাপন

অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ডের মুনাফা বাড়লেও বঞ্চিত বিনিয়োগকারী

অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ডের মুনাফা বাড়লেও বঞ্চিত বিনিয়োগকারী

২০২৫-২৬ অর্থবছরে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ড বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে। তবে ফান্ডগুলো ঘুরে দাঁড়ালেও ‘ভরসা’ করা বিনিয়োগকারীদের কপাল খোলেনি। কারণ আগের বছরগুলোর পুঞ্জীভূত লোকসানের কারণে মুনাফা করেও অধিকাংশ ফান্ড এবার বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।

গত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা ১৫টি মেয়াদি (ক্লোজড-ইন্ড) মিউচুয়াল ফান্ডের সম্মিলিত মুনাফা হয়েছে প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এসব ফান্ডের সম্মিলিত মুনাফা ছিল মাত্র ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ১৪১ কোটি টাকার বেশি।

তালিকাভুক্ত ৩৪টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১৬টি ফান্ড নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম যাচাইয়ের আওতায় রয়েছে। ফলে এসব ফান্ডের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। আর তিনটি ফান্ড জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিতে হিসাব বছর অনুসরণ করে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা ১৫টি ফান্ডের সব কটিই আলোচিত বছরে মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ১১টি ফান্ড আগের বছর লোকসানে থাকার পর এবার মুনাফায় ফিরেছে। বাকি চারটি ফান্ডের মুনাফাও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।

ভালো মুনাফা করা সত্ত্বেও ১৫টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র চারটি ফান্ড আলোচিত অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হওয়া চার ফান্ডের তিনটি লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর লোকসান কাটিয়ে মুনাফায় ফেরা অপর ফান্ডও লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বশেষ অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে শেয়ারবাজার তুলনামূলক ভালো পারফরম্যান্স করায় অধিকাংশ ফান্ডের মুনাফা বেড়েছে। তবে আগের বছরগুলোর বড় ধরনের লোকসানের কারণে অনেক ফান্ডের পুঞ্জীভূত মুনাফা তহবিল এখনো ঋণাত্মক রয়েছে। ফলে এ বছরের মুনাফা দিয়ে আগের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ না হওয়ায় অনেক ফান্ডই বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। তাছাড়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ফান্ড নিট মুনাফা করলেও ট্রাস্টিরা চাইলে নগদ লভ্যাংশ না দিয়ে সেই অর্থ ফান্ডের সুরক্ষায় সংরক্ষণ করতে পারেন। এ কারণেও কোনো কোনো ফান্ড লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি।

মুনাফায় বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত

২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষার্ধে দীর্ঘ মন্দার পর দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা ফেরার পাশাপাশি বাজার সংস্কার নিয়েও প্রত্যাশা বাড়ে। এতে শেয়ারের দাম বাড়ার সুযোগ তৈরি হয় এবং মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বিনিয়োগের মূল্যও বেড়ে যায়।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স অর্থবছরটিতে প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৭৬৩ পয়েন্টে উঠে। একই সময়ে ডিএসইর বাছাই করা ৩০ কোম্পানির সূচক ডিএস৩০ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৭৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। বাজার মূলধনও প্রায় ৩৬ হাজার ৪২১ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে ৬ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

মিউচুয়াল ফান্ডগুলো মূলত শেয়ারবাজারের বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। তারা ডিএসইর বাছাই করা সূচক ডিএস৩০-এর কোম্পানিগুলোতে বেশি বিনিয়োগ করে থাকে। ফলে বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লে এসব ফান্ডের পোর্টফোলিওর মূল্যও বাড়ে এবং শেয়ার বিক্রি করে মূলধনি মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হয়।

এ বিষয়ে রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা বিভাগের প্রধান আকরামুল ইসলাম বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডের আয় অনেকটাই শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। শেয়ার কেনাবেচা থেকে মূলধনি মুনাফার পাশাপাশি লভ্যাংশ, সুদ ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকেও ফান্ডগুলো আয় করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায় ফান্ডগুলো উল্লেখযোগ্য মূলধনি মুনাফা করতে পেরেছে।

তার মতে, মৌলভিত্তিসম্পন্ন ভালো কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করা ফান্ডগুলো বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছে। দীর্ঘদিনের মন্দার সময়ে কম দামে কেনা শেয়ারগুলোর মূল্য বাড়ায় অনেক ফান্ড সেগুলো বিক্রি করে ভালো মুনাফা তুলে নিয়েছে।

কোন ফান্ড কেমন মুনাফা করল

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৫টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড। ক্যাপিটেক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত এই ফান্ডটি আলোচিত অর্থবছরে ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। আগের অর্থবছরে ফান্ডটির মুনাফা ছিল ৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুনাফা করেছে এইমস অব বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায় থাকা গ্রামীণ ওয়ান স্কিম-২। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফান্ডটির মুনাফা হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই মুনাফা ছিল ১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত আইসিবি এএমসিএল থার্ড এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড মুনাফার তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। ফান্ডটির মুনাফার পরিমাণ ১৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে ফান্ডটির ২০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে থাকা আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ডের মুনাফা হয়েছে ১৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এই মুনাফা ছিল ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তালিকার পঞ্চম অবস্থানে থাকা প্রাইম ব্যাংক ফার্স্ট আইসিবি এএমসিএল মিউচুয়াল ফান্ডের মুনাফা হয়েছে ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে ফান্ডটি ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা লোকসান করেছিল।

আগের অর্থবছরে ৪০ লাখ টাকা লোকসান করা আইসিবি এএমসিএল সোনালী ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১ কোটি ২০ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ফনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড আগের অর্থবছরে ১ কোটি ২ লাখ টাকা লোকসান করলেও সর্বশেষ অর্থবছরে ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। আর আলোচিত অর্থবছরে ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা মুনাফা করা আইএফআইএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড-১ আগের অর্থবছরে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা লোকসান করেছিল।

এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইসিবি এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান: স্কিম ওয়ান ৮ কোটি ৪০ লাখ, আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ৭ কোটি ৩৫ লাখ, রিলায়েন্স ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ড ৭ কোটি, সিএপিএম বিডিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড ৬ কোটি ৭৭ লাখ, এসইএমএল এফবিএলএসএল গ্রোথ ফান্ড ৬ কোটি ৫৭ লাখ এবং সিএপিএম আইবিবিএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। আগের অর্থবছরে ফান্ডগুলো যথাক্রমে ১ কোটি ৭৩ লাখ, ৭৫ লাখ, ১ কোটি ৮৮ লাখ, ৫ কোটি ৭৭ লাখ, ৭ লাখ এবং ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা লোকসান করেছিল। আর সর্বশেষ অর্থবছরে ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা মুনাফা করা এসইএমএল আইবিবিএল শরিয়াহ ফান্ড আগের অর্থবছরে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল।

মুনাফা হলেও লভ্যাংশ মাত্র চার ফান্ডের

মুনাফায় বড় ধরনের উন্নতি হলেও ১৫টি ফান্ডের মধ্যে মাত্র চারটি ফান্ড ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এসব ফান্ডের লভ্যাংশের হার ৪ থেকে ১০ শতাংশ। আলোচিত অর্থবছরে রিলায়েন্স ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি ফান্ডটির বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে যৌথভাবে ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড ও গ্রামীণ ওয়ান : স্কিম-২। ফান্ড দুটির ট্রাস্টি পৃথকভাবে নিজ নিজ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৯ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আর আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি ৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।

মিউচুয়াল ফান্ডগুলো ভালো মুনাফা করেও লভ্যাংশ দিতে না পারার প্রধান কারণ হিসেবে বিগত বছরগুলোর পুঞ্জীভূত লোকসানকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকেরা। এ বিষয়ে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের মন্দায় অনেক ফান্ডের পোর্টফোলিওর মূল্য ব্যাপকভাবে কমে যায়। এতে ফান্ডগুলোর পুঞ্জীভূত মুনাফার তহবিল ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। ফলে আগের লোকসানের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি রাখার পর লভ্যাংশ দেওয়ার মতো অবস্থায় অনেক ফান্ড নেই।

তার মতে, ফান্ডগুলো যখন বিনিয়োগ করেছিল, তখন শেয়ারের মূল্য অনেক বেশি ছিল। পরে শেয়ারের দামে বড় পতন হওয়ায় বিনিয়োগের মূল্য কমে যায়। গত এক বছরে বাজার অনেকটা ঘুরে দাঁড়ালেও আগের লোকসান পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি অনেক ফান্ড। ফলে অর্জিত মুনাফা দিয়ে তারা লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করতে পারেনি।

বাজারদরের চেয়ে সম্পদমূল্য বেশি

মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো, শেয়ারবাজারে তাদের ইউনিটের দামের সঙ্গে প্রকৃত সম্পদমূল্যের (এনএভি) বড় ব্যবধান। ৩৪টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩০টিই এখন ডিসকাউন্টে বা সম্পদমূল্যের চেয়ে কম দামে লেনদেন হচ্ছে।

গত সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, এসব ফান্ডের সম্মিলিত বাজার মূলধন প্রায় ৩ হাজার ৭০ কোটি টাকা। বিপরীতে সম্মিলিত ফান্ডগুলোর ব্যবস্থাপনা সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ফান্ডগুলোর প্রকৃত সম্পদমূল্যের তুলনায় বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে।

বাজারমূল্যে পিছিয়ে থাকার বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নজরেও এসেছে। বিদ্যমান মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালায় ডিসকাউন্টে লেনদেন হওয়া মেয়াদি ফান্ডগুলোকে বে-মেয়াদি ফান্ডে রূপান্তর অথবা অবসায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃত মূল্যের তুলনায় বাজারমূল্য ২৫ শতাংশ বা তার বেশি ডিসকাউন্টে লেনদেন হওয়া ফান্ডগুলো এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসতে পারে। এরইমধ্যে একটি ফান্ড মেয়াদি থেকে বে-মেয়াদি ফান্ডে রূপান্তরিত হয়েছে। আরেকটি বে-মেয়াদি ফান্ডের রূপান্তর অথবা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিতে আগামী ৭ অক্টোবর বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আহ্বান করা হয়েছে।

এমএমএইচ/জেডএস