‘প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখার জন্য নানা উপায়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু সফল হতে পারলাম না।’ দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের সমাপ্তি টেনে এভাবেই কারখানা বন্ধের আবেগঘন ঘোষণা দিলেন ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল হাসান ফয়সাল।
মিরপুরের রূপনগর শিল্প এলাকায় ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস লিমিটেড। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটিতে ১৫০টি মেশিন ছিল এবং এর প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল টি-শার্ট ও ট্যাংক টপ। গত দুই বছর ধরে নানা প্রতিকূলতায় কারখানাটির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক চাপ ও আর্থিক সংকটের মুখে কারখানাটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হলো।
কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া নোটিশে মালিক মাহবুবুল হাসান ফয়সাল জানান, শুধু ব্যবসায়িক মন্দা নয়, কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের অপতৎপরতার কারণেও কারখানাটি চরম সংকটে পড়ে।
অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে তিনি বিদায় নিচ্ছেন উল্লেখ করে সংকটের দিনে পাশে থাকা দক্ষ ও উৎসর্গীকৃত কর্মীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, অভিজ্ঞ কর্মী ও কর্মকর্তারা দ্রুতই নতুন কর্মসংস্থান খুঁজে পাবেন।
কারখানা বন্ধের পর নিজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা জানিয়ে তিনি জানান, সব পাওনাদারের দেনা চুকিয়ে যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন এবং পরবর্তীতে নতুন কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে পুরোনো কর্মীদের আবার কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারেন, সেজন্য সবার দোয়া প্রার্থী।
এদিকে ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস বন্ধের মধ্য দিয়ে তৈরি পোশাক খাতের গভীর সংকটের চিত্র আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘একটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে নানা চাপে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং একপর্যায়ে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠছে।’
পোশাক খাতের সংকট তুলে ধরে তিনি আরও জানান, ব্যাংকিং সংকট, তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং পণ্যের দরপতনের মধ্য দিয়ে তৈরি পোশাক খাত পার হচ্ছে। এর ওপর শ্রমিকদের মজুরি ৯ শতাংশ বৃদ্ধির অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে গিয়ে অনেক কারখানার আয়-ব্যয়ের সমীকরণ মিলছে না।
বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, দেশের গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার আগেই অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। গ্যাস সংকট এসে সেই দুর্বলতার ওপর চূড়ান্ত আঘাত হেনেছে।
তিনি বলেন, গত দুই-তিন বছরে দেশে ৩০০টিরও বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ম্যাট্রিক্স ড্রেসেসের বন্ধ হয়ে যাওয়া তাই কেবল একটি কারখানার দরজা বন্ধ হওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে গেল একজন উদ্যোক্তার বছরের পর বছর করা বিনিয়োগ, শত শ্রমিক-কর্মচারীর জীবিকা এবং জড়িয়ে রইল পাওনাদারদের অনিশ্চিত অর্থ।
এসআই/এমএসএ
