বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.১৪ শতাংশ। একই সময়ে দেশের মানুষের মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২০ ডলারে। তবে প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক সূচকের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা চাপের ইঙ্গিতও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বৃহৎ শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং একই সঙ্গে জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাতও হ্রাস পেয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বর্তমান বাজারমূল্যে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা, যা ডলারের হিসাবে প্রায় ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা বা ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। স্থির মূল্যে বিদায়ী অর্থবছরের জিডিপির আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ৩৪ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রকৃত উৎপাদন বৃদ্ধির ভিত্তিতে দেশের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলেও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম।
জিডিপির প্রধান তিনটি খাত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কৃষি ও সেবা খাতে উন্নতি হলেও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির পতন হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.৭৮ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২.৪২ শতাংশ। সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৫৯ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৪.৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে শিল্প খাত, যেখানে প্রবৃদ্ধি ৩.৭১ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.৮৬ শতাংশে।
অর্থনীতির অপর গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও মন্দা দেখা গেছে। সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ২৭.৯৩ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ২৮.৫৪ শতাংশ। একই সঙ্গে দেশজ সঞ্চয়ের অনুপাত ২১.৯৮ শতাংশ থেকে কমে ২১.৩৮ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাত ২৭.৬৭ শতাংশ থেকে কমে ২৬.৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে মাথাপিছু আয়ের চিত্র। বিদায়ী অর্থবছরে দেশে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৩ টাকা বা ৩ হাজার ২০ ইউএস ডলার। পূর্ববর্তী অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫১১ টাকা বা ২ হাজার ৭৬৯ ইউএস ডলার। এই হিসাব প্রণয়নের ক্ষেত্রে জুলাই-মার্চ সময়ের ডলারের গড় বিনিময় হার ১২২.১৪ টাকা ধরা হয়েছে।
কৃষি খাতের অভ্যন্তরীণ চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিডিপিতে চলতি মূল্যে এই খাতের অবদান ১১.৮৫ শতাংশ। তবে প্রধান শস্যের মধ্যে আউশ ও পাটের উৎপাদনে পতন ঘটেছে। বিদায়ী অর্থবছরে আউশের উৎপাদন ২৭.০৮ লক্ষ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ২৭.৯৩ লক্ষ মেট্রিক টন। পাটের উৎপাদনও ১.৮৫ শতাংশ কমে ১৫.৯৪ লক্ষ মেট্রিক টন হয়েছে। তবে আমনের উৎপাদন ৫.১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৭৩.৫৯ লক্ষ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া শাকসবজির উৎপাদন ৩.৩৯ শতাংশ, ফলের উৎপাদন ৫.৯৭ শতাংশ এবং মসলাজাতীয় ফসলের উৎপাদন ১.৪০ শতাংশ বেড়েছে।
বিবিএসের এই সার্বিক সাময়িক হিসাব বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি দ্বিমুখী চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে জিডিপির আকার ও মাথাপিছু আয় বাড়লেও বৃহৎ শিল্পে প্রবৃদ্ধি ৫.১৪ শতাংশ থেকে ১.৯৭ শতাংশে নেমে আসা এবং সঞ্চয় কমে যাওয়া মূল অর্থনীতির উৎপাদন ও বিনিয়োগ সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
এসআর/আরএফ
