বিজ্ঞাপন

ইসলামী ব্যাংকে ধস ও গোপন খেলাপি: তোপের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংকে ধস ও গোপন খেলাপি: তোপের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

দেশের মোট ব্যাংকিং খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ শরীয়াহভিত্তিক হওয়া সত্ত্বেও মুদ্রানীতিতে ইসলামী ব্যাংকিংকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া এবং একক ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার আমানত উত্তোলনের ঘটনায় সংসদীয় কমিটিতে কড়া তোপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থ সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সদস্যরা তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা অভিযোগ করেন, শরীয়াহ বোর্ডের চরম দুর্বলতা ও সুশাসনের অভাবের কারণে পুরো ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসে পড়ার উপক্রম হলেও অনিয়ম রুখতে এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ভূমিকা পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে গোপন রাখা খেলাপির প্রকৃত তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণমূলক দক্ষতা ও তদারকি ক্ষমতা নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তোলেন কমিটির সদস্যরা।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কমিটির সদস্যবৃন্দ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং অর্থ বিভাগের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

আলোচনার শুরুতেই কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে ‘মিনি পার্লামেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে এর প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যকলাপের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের কাজের গতিশীলতা ও জবাবদিহিতা আনা সম্ভব হয়। সকলেই সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে দেশ ও জাতি প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে।

এরপর কার্যপত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক উপস্থাপিত প্রতিবেদনটির ওপর আলোকপাত করে তিনি বলেন, এটি তথ্যসমৃদ্ধ হলেও বেশ কারিগরি ও জটিল হওয়ায় বৈঠকে মূল বিষয়গুলো সংক্ষিপ্ত ও সহজভাবে উপস্থাপন করা আবশ্যক। একই সঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামো, জনবল ও দায়িত্ব বণ্টন সংক্রান্ত তথ্য, বিগত ৩-৪ বছরের মুদ্রানীতির কার্যকারিতার ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা সম্পর্কিত স্পষ্ট ব্যাখ্যার ঘাটতি ছিল। পরবর্তীতে সরকারের বিনিয়োগ, উৎপাদনমুখী নীতি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে নীতিগত সহায়তা প্রদান করছে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যার দাবি জানান সভাপতি।

দেশের মোট ব্যাংকিংয়ের ৩০ শতাংশ শরীয়াহভিত্তিক হওয়া সত্ত্বেও মুদ্রানীতিতে এ খাতকে উপেক্ষা করা এবং একক ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক তোপের মুখে পড়েছে। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অভিযোগ করা হয়, শরীয়াহ বোর্ডের দুর্বলতার কারণে পুরো ব্যবস্থা ধসে পড়ার উপক্রম হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা রুখতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন গোপন রাখা খেলাপির প্রকৃত তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় সংস্থাটির তদারকি ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে

কমিটির আহ্বানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই বিষয়ে প্রযুক্তিগত ও বিস্তারিত বিবরণ উপস্থাপনের জন্য তিনি ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমানকে অনুমতি দেওয়ার জন্য সভাপতির নিকট অনুরোধ জানান।

dhakapost
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক / ছবি- সংগৃহীত

সভাপতির অনুমতির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান তার বিস্তারিত পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে দেশের সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতি, মুদ্রানীতির পরিবর্তন এবং রূপান্তর প্রক্রিয়ার নানা দিক উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী ব্যাংকের যে ৬টি মূল বিধিবদ্ধ দায়িত্ব রয়েছে, তার মধ্যে মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নই সর্বদা সর্বাগ্রে বিবেচিত হয়। মুদ্রানীতির প্রাথমিক ও প্রধান লক্ষ্য হলো— মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা দেওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত রাখা। এর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ব্যবস্থাপনা, সরকারকে কৌশলগত নীতিগত সহায়তা প্রদান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিচালনা, নতুন মুদ্রা ও নোট ইস্যু করা, আধুনিক পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনা এবং তফসিলি ব্যাংকসমূহের তদারকি নিশ্চিত করাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্পিত দায়িত্বের অংশ।

ঐতিহাসিক রূপান্তর তুলে ধরে ডেপুটি গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের মেয়াদে গৃহীত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ সালে দেশে প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতের ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ১৯৯৩ সালে ‘মনিটারি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনিক্যাল ইউনিট’ গঠনের মধ্য দিয়ে মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সূচনা হয়, যা পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ ‘মনিটারি পলিসি ডিপার্টমেন্ট’-এ রূপান্তরিত করা হয়। পাশাপাশি দেশের বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় নানা সময়ে ব্যাপক সংস্কার আনা হয়; যার ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে ‘ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট’ থেকে ‘ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট রেজিম’-এ রূপান্তর এবং ২০২৩ সালে ‘ক্রলিং পেগ রেজিম’ চালুর মাধ্যমে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

কৌশলগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, অতীতে ‘মানি সাপ্লাই’, ‘রিজার্ভ মানি’ এবং ‘হাই পাওয়ারড মানি’-কে মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে, বৈশ্বিক কাঠামোর পরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাতের বিকাশের কারণে ‘মানি সাপ্লাই’ এবং ‘মূল্যস্ফীতি’-র মধ্যকার পূর্বের স্থিতিশীল সম্পর্কটি শিথিল হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যান্য আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকও ‘মনিটারি টার্গেটিং’ থেকে সরে এসে ‘ইন্টারেস্ট রেট টার্গেটিং’ বা নীতি সুদভিত্তিক মুদ্রানীতির দিকে মোড় নিয়েছে। তবে, গত তিন বছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকভাবে নীতি সুদের হার বাড়ানো সত্ত্বেও সরবরাহের দিকটি আন্তর্জাতিক বাজার ও সরকারের অন্যান্য সংস্থার ওপর নির্ভর করায় প্রত্যাশিত ফল শতভাগ মেলেনি, যদিও মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে মুদ্রানীতির ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই পরিস্থিতিতে দেশের বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানান ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান।

সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান স্বীকার করেন যে, প্রচলিত বিশ্বজনীন নিয়ম অনুযায়ী সুদের হার বাড়লে মূল্যস্ফীতি কমার কথা থাকলেও বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তা কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ২০২৩ সাল থেকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করার পরেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাদে অন্যান্য সূচকে অগ্রগতি অর্জন করা যায়নি; বরং বেসরকারি ঋণপ্রবাহ ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশ একটি তীব্র আমদানি-নির্ভর দেশ, তাই এখানকার মূল্যস্ফীতি প্রধানত সরবরাহ-পক্ষের জটিলতা থেকে সৃষ্ট। সুদের হার বেশি রাখার কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে অদূর ভবিষ্যতে বিশেষ সভা ডেকে নীতি সুদের হার পুনর্মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে বারবার নীতি সুদের হার বাড়ানো হলেও দেশে মূল্যস্ফীতি কার্যকরভাবে কমেনি, বরং বেসরকারি ঋণপ্রবাহ ও নতুন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। আমদানিনির্ভর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সুদের হার বেশি থাকায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে উল্টো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় দেশের স্তব্ধ অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফেরাতে ও শিল্পায়ন বাড়াতে অবিলম্বে নীতি সুদের হার একক অঙ্কে কমিয়ে আনার জোরালো তাগিদ দিয়েছেন সংসদ সদস্যরা

গভর্নর স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ভয়াবহ সংকটে নিমজ্জিত ছিল। অনিয়ম, বিপুল আমানত পাচার এবং তীব্র তারল্য সংকটে পড়ে একাধিক ব্যাংকের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল নীতি সুদের ওপর নির্ভর না করে সহায়ক নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন— বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার রুখতে সুদের মার্জিন বেঞ্চমার্ক প্লাস চার শতাংশ থেকে কমিয়ে তিন শতাংশে নামানো হয়েছে এবং ব্যাংকের সুদের ‘স্প্রেড’ সর্বোচ্চ চার শতাংশে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণ (নন-পারফর্মিং লোন) আদায়ে ১৮ মাসের একটি বিশেষ রোডম্যাপ গ্রহণ করা হয়েছে, যার প্রথম ৬ মাসে ব্যাংক-গ্রাহক সমঝোতার সুযোগ থাকবে এবং পরের ১২ মাসে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ ও সংশোধিত ‘অর্থ ঋণ আদালত আইন’ প্রয়োগ করে সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী বা ‘আল্টিমেট বেনিফিশিয়ারি’ চিহ্নিত করে আইনি জবাবদিহিতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

dhakapost

৬০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রণোদনা প্যাকেজে অতীতে তহবিলের অপব্যবহার রোধে কঠোর শর্ত আরোপের কথা জানিয়ে গভর্নর বলেন, এতে বড় গ্রুপের বদলে ক্ষুদ্র ও উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। তিনি স্বীকার করেন, দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যা নিয়ে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংকে বিশেষ নিরীক্ষা, সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং ফরেনসিক অডিট শুরু হয়েছে এবং গোপন রাখা খেলাপি ঋণ পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হচ্ছে। এ ছাড়া মুদ্রানীতি প্রতি ৬ মাসের জায়গায় প্রতি ৩ মাস অন্তর পর্যালোচনার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সঙ্গে খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত বাস্কেটের তথ্য সংশোধন, আইএফআরএস-৯ পর্যায়ক্রমে চালুকরণ, ওয়েবসাইট আধুনিকায়ন, মুদ্রানীতি দ্বিভাষিক করা এবং রুগ্ন শিল্প তহবিলের জন্য আলাদা স্টিয়ারিং কমিটি চালুর তথ্য প্রদান করেন গভর্নর। তিনি ইসলামী ব্যাংকিং সংস্কারে শরীয়াহ বোর্ড পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সার্বিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম কার্যপত্র বিলম্বে প্রাপ্তির কারণ জানতে চান। কমিটি সচিব জানান যে, সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের শেষে কার্যপত্র পাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে হোয়াটসঅ্যাপে এবং বিশেষ বাহক মারফত সদস্যদের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যার চালান সংরক্ষিত আছে। চিফ হুইপ নির্দেশ দেন যে, ভবিষ্যতে যেন কার্যপত্র ও উপস্থাপনার লিখিত কপি সভার অন্তত এক থেকে দুই দিন পূর্বে সরবরাহ করা হয়, যাতে সদস্যরা পর্যাপ্ত পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে কার্যকর আলোচনা করতে পারেন। বৈঠকে সংশ্লিষ্টদের যথাসময়ে উপস্থিতির ওপর তাগিদ দিয়ে তিনি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বের ওপর গভীর আস্থা প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করতে সভাপতিকে অনুরোধ জানান।

সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন বর্তমান সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে নীতি সুদের হার না কমানোকে চরম হতাশাজনক বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, উচ্চ সুদের হার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তাই অনতিবিলম্বে নীতি সুদের হার কমানো জরুরি। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের কাঠামোগত পুনর্গঠনের জোর দাবি জানিয়ে তিনি ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঘোষিত ‘নিরাপদ প্রস্থান’ বা সেফ এক্সিট সুবিধার মেয়াদ ৩০ ডিসেম্বর থেকে বাড়িয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব করেন। যেকোনো কোম্পানির ইচ্ছুক পরিচালকদের এককভাবে এই সুবিধা ব্যবহারের পথ উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে অন্য কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানের সিআইবি (CIB) রিপোর্টে যেন প্রভাব না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখার আহ্বান জানান। বিশেষ করে এসএমই (SME) উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার দাবি এবং ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অনিয়ম তদন্তে সংসদীয় উপকমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।

সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম দেশের স্তব্ধ অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে নীতি সুদের হার একক অঙ্কে কমিয়ে আনার এবং তা কোনোক্রমেই সাড়ে নয় শতাংশের ওপরে না রাখার আহ্বান জানান। খেলাপি ঋণ উদ্ধারে তৃতীয় পক্ষ বা থার্ড পার্টি নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া বজায় রাখার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে ঋণ খেলাপির জন্য শুধু গ্রহীতাকে নয়, ঋণ অনুমোদনকারী ব্যাংক পরিচালকদেরও সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন করার দাবি জানান। অতীতে প্রণোদনার টাকা উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে অপব্যবহার হওয়ার অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। সুদের হার কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি। মহানবী (সা.) কর্তৃক ঋণগ্রস্তদের জানাজা না পড়ার ধর্মীয় দৃষ্টান্ত স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবং একটি ইসলামী ব্যাংক থেকে মাত্র এক মাসে ২৪ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের ঘটনা তুলে ধরে তিনি অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন ও গভর্নরের নেতৃত্বে শৃঙ্খলার আহ্বান জানান।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুজ্জীবিত করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বিবেচনা করা হচ্ছে, যেখানে অতীতে তহবিলের অপব্যবহার রোধে বড় গ্রুপের বদলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গভর্নর জানিয়েছেন, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত খেলাপি ঋণ উদ্ধার ও সম্পদ নিরীক্ষায় ১৮ মাসের রোডম্যাপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশ ফেরাতে ও মুদ্রানীতি কার্যকরে প্রতি তিন মাস অন্তর পর্যালোচনার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক

সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত পূর্বে প্রতি ৩ মাস অন্তর মুদ্রানীতি পর্যালোচনার নিয়ম পরিবর্তন করে ৬ মাস করায় ত্রুটি সংশোধনে অতিরিক্ত সময় ক্ষয় হওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন এবং ভারতের ‘মুদ্রানীতি জবাবদিহিতা কমিটি’র আদলে প্রতি ৩ মাস পরপর পর্যালোচনা চালুর তাগিদ দেন। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতি রেখে মূল্যস্ফীতি পরিমাপের বাস্কেট সংশোধনের কথা বলেন তিনি। সংকোচনমূলক নীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাড়ে সাত শতাংশে আনার চেষ্টার মধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ‘হাই পাওয়ারড মানি’ থেকে জোগানোর সিদ্ধান্তকে পরস্পরবিরোধী বলে উল্লেখ করেন তিনি। এতে মানি মাল্টিপ্লায়ারের প্রভাবে সার্বিক মুদ্রা সরবরাহ কতটা বাড়বে এবং কেন এই অর্থ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে না দিয়ে রিজার্ভ মানি ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলে রাজনৈতিক তদবির ও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কার কথা জানান। মার্চের রিপোর্ট অনুযায়ী খেলাপি ঋণ ৩২.২৬ শতাংশ দেখালেও বিপুল অঘোষিত খেলাপি বাদ পড়ে আছে উল্লেখ করে তিনি সেগুলো অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানান এবং মুদ্রানীতি সহজে অনুধাবনের জন্য সহজবোধ্য বাংলা সংস্করণের সুপারিশ করেন।

dhakapost

সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খান রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল কোন প্রক্রিয়ায় ও কোন ক্যাটাগরির শিল্পে বিতরণ করা হবে এবং বন্ধ কারখানা চালু ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে এর সঠিক পর্যবেক্ষণ কীভাবে হবে তা বিস্তারিত জানতে চান। পূর্বে দেওয়া ‘এককালীন প্রস্থান’ বা ওয়ান-টাইম এক্সিট সুবিধার সুনির্দিষ্ট ফলাফল জানতে চাওয়ার পাশাপাশি বর্তমান রূপরেখা বাস্তবায়নে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অনীহার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ কী হবে, তার ব্যাখ্যা দাবি করেন।

সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দিন মুদ্রানীতির সংবেদনশীলতার কথা বিবেচনা করে বৈঠকের পূর্বেই কার্যপত্র সরবরাহের তাগিদ দেন। সরকারের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সুদের হারভিত্তিক নীতি থেকে মূল্যস্ফীতি-লক্ষ্যভিত্তিক নীতিতে উত্তরণ ঘটাতে হলে সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং উপাত্তের ঘাটতি দূর করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয় ও অর্থ লুটপাটে যুক্ত মূল হোতা ও সহযোগীদের আইনি প্রক্রিয়ায় এনে কঠিন শাস্তি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে একটি সংসদীয় উপকমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। ব্যাংকিংয়ে কমপ্লায়েন্স ও ডিউ ডিলিজেন্স নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনবান্ধব বাজেট প্রণয়নে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজের প্রশংসা করেন।

সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন অতীতে অনুসৃত ‘নয়/ছয়’ সুদ ব্যবস্থার নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে সতর্কতার সঙ্গে মুদ্রানীতি তৈরির তাগিদ দেন। দেশের ব্যাংকিংয়ের ৩০ শতাংশ শরীয়াভিত্তিক হওয়ায় মুদ্রানীতিতে এই খাতের সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী প্রতিফলন দাবি করেন। ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ নীতি আরও কড়া করে নামমাত্র টাকায় দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নেওয়ার পথ বন্ধ করার সুপারিশ করেন। ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ যেন অনুৎপাদনশীল খাত বা খেলাপিদের পুনঃঅর্থায়নে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং বিভাগ শক্তিশালীকরণ এবং মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে ‘দ্বৈত ব্যাংকিং ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি ৩ মাস পরপর মুদ্রানীতি পর্যালোচনার জোর দাবি জানান।

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সকলকে ধন্যবাদ জানান। তিনি জানান, সভার সময় স্বল্পতা থাকার কারণে এদিন বিস্তারিত বক্তব্য রাখছেন না, তবে পরবর্তী বৈঠকে পূর্ণাঙ্গ পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে প্রতিটি বিষয়ে বিষদ আলোচনায় অংশ নেবেন।
 
কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হচ্ছে সরকারের সার্বিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি প্রধান সাংবিধানিক মাধ্যম। কমিটির সদস্যগণ যাতে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিতে পারেন, সে জন্য কার্যপত্র অন্তত এক বা দুই দিন আগেই সদস্যদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার কড়া তাগিদ দেন। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, আগামীতে এই কমিটির বৈঠকসমূহ পর্যাপ্ত সময় নিয়ে নিয়মিতভাবে আয়োজিত হবে এবং অর্থনীতির প্রতিটি সূচক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে। আজকের বৈঠক পরিচয়মূলক হওয়ায় প্রাথমিক মতামত ও গভর্নরের ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে এই কমিটি ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী নিয়মিত বৈঠক আয়োজন এবং আগাম কার্যপত্র সরবরাহে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।

সমাপনী বক্তব্যে সভাপতি মুশফিকুর রহমান পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্থায়ী কমিটির বৈঠকের কার্যপত্র অন্তত দুই দিন আগে সদস্যদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজে যত বেশি স্বচ্ছতা আসবে, দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ ততটাই উন্নত হবে। পরবর্তী বৈঠকে ব্যাংকিং খাত, কস্ট অব ফান্ড, ঋণের কার্যকর সুদের হার এবং উদ্যোক্তাদের সমস্যা নিয়ে মূল আলোচনা হবে। অনেক উদ্যোক্তার অভিযোগ অনুযায়ী ঋণের প্রকৃত সুদ হার ১৮ থেকে ১৯ শতাংশে পৌঁছে যাচ্ছে, যা পর্যালোচনা করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকার দেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে অঙ্গীকারবদ্ধ। তাই শুধু মুদ্রানীতি নয়, সমন্বিত সম্প্রসারণমূলক অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োজন। এনবিআরসহ অন্যান্য সংস্থাকে নিয়ে পর্যায়ক্রমে বৈঠক করা হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহের বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা করে সরকার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে কমিটি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে।

এসআর/এমএআর/