জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় দেশের তৈরি পোশাকশিল্প কঠিন সময় পার করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতারা।
তাদের দাবি, গত তিন বছরে উচ্চ ব্যয় ও অর্ডার-সংকটের কারণে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
এসব সংকট থেকে উত্তরণে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, ঋণের সুদের হার কমানো, রপ্তানি-পরবর্তী অর্থায়ন সুবিধা চালু, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে নতুন চুক্তি করার উদ্যোগসহ একাধিক সুপারিশ রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে তুলে ধরেছে বিজিএমইএ।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের একটি প্রতিনিধিদল।
সাক্ষাতে পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন, বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, সহ-সভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ রফিক চৌধুরীসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা।
বিজিএমইএর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে জানানো হয়, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করতে পারছে। এতে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
সংগঠনটির হিসাবে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং মজুরি সমন্বয়ের কারণে গত তিন বছরে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
বিজিএমইএ আরও বলেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসেও রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। অন্যদিকে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়ছে।
উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি আদেশের সংকট সামাল দিতে না পেরে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির মতে, এ পরিস্থিতি শুধু শিল্পের সক্ষমতাকেই নয়, কর্মসংস্থানকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
পোশাকশিল্পের এই সংকট কাটিয়ে উঠতে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
গ্যাস-সংকট মোকাবিলায় দ্রুত আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) স্থাপনের সুপারিশ করেছে বিজিএমইএ।
সংগঠনটি বলেছে, নতুন এফএসআরইউ যুক্ত করা গেলে আমদানি করা এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখা এবং এলএনজি আমদানির পর্যায়ে শুল্ক-কর প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
১৫০ থেকে ৫০০ কেজি বয়লার রয়েছে, এমন ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত গ্যাস সংযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে দীর্ঘমেয়াদি কম সুদের বিশেষ ঋণ সুবিধার প্রস্তাবও দিয়েছে বিজিএমইএ।
পোশাক রপ্তানির পরিবহনব্যবস্থা ও লজিস্টিকস উন্নয়নে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। এ ছাড়া হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বড় কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করে চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
চলতি মূলধন ও বাণিজ্যঋণের সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। পোশাক খাতের জন্য বিশেষায়িত ‘পোস্ট-শিপমেন্ট ফাইন্যান্সিং স্কিম’ চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) ও টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে (টিডিএফ) অর্থ বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করতে কাস্টমসের বন্ড অডিট প্রক্রিয়া জটিলতামুক্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক করার প্রস্তাব দিয়েছে বিজিএমইএ। পোশাক কারখানার কাঁচামাল দ্রুত সরবরাহের জন্য বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যেন শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পায়, সে জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের সুপারিশ করেছে বিজিএমইএ।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশ ও অঞ্চলগুলোর সঙ্গে এফটিএ, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) করার উদ্যোগ দ্রুত নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
পোশাকশ্রমিকদের কল্যাণে গাজীপুরে আধুনিক হাসপাতাল ও কল্যাণকেন্দ্র নির্মাণের জন্য দ্রুত জমি বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে বিজিএমইএ। এ ছাড়া পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
সাক্ষাতে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান দেশীয় শিল্প ও ব্যবসার প্রসারে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করা, নিষ্ক্রিয় ও বন্ধ পোশাক কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা, নন-বন্ডেড কারখানার জন্য বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরাসরি রপ্তানির সুযোগ সহজ করা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি।
বিজিএমইএর নেতারা মনে করেন, এসব উদ্যোগ শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করেছে এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটেছে।
সাক্ষাতে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল পোশাকশিল্পে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান এবং পোশাকশিল্পকে হরতালের আওতামুক্ত রাখতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথাও স্মরণ করে।
বিজিএমইএ নেতাদের বক্তব্য সহানুভূতির সঙ্গে শোনেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি তৈরি পোশাকশিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, সাময়িক প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখা জরুরি।
এ লক্ষ্যে শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
এমএমএইচ/এমএসএ
